Site icon কালাক্ষর

লুই পাস্তুরঃ মানব কল্যানে আমৃত্যু কাজ করে যাওয়া এক মহা বিজ্ঞানীর জীবন কথা

লুই পাস্তুর

ছবি - লুই পাস্তুর। সোর্স - sciencehistory.org

সৃজনশীল বাংলা ব্লগ “কালাক্ষর” এ বিসৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কোন ঘটনা কিংবা ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখা কোন মনিষীর জীবনে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা কিংবা তার কোন কর্ম আমরা আপনাদের সামনে সব সময় তুলে ধরতে চাই।  এর ধারাবাহিকতায় আজ আমরা এমন এক মানুষের ব্যাপারে আপনাদের জানাতে যাচ্ছি যিনি তার কর্মের দ্বারা জগত বিখ্যাত হয়ে আছেন । তার কি নাম হেডলাইন দেখে এতক্ষনে জেনে গেছেন কিন্তু আমি তার নাম বলার আগে ছোট্র একটা ঘটনার কথা বলবো –

ফ্রান্সের প্যারিসের একটি চার্চে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের বেশ ঘটা করে আয়োজন চলছে। বিয়ের জন্য নির্ধারিত সময়ে কনেপক্ষের লোকজন কনেকে নিয়ে উপস্থিত। পাত্রপক্ষের ভিতরেও অনেকেই ইতিমধ্যে উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু যার বিয়ে সেই বর এখনও কোন খোঁজ নাই। 

চার্চের পাদ্রী সহ সবাই গুনধর পাত্র মহাদয়ের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকে বিরক্তির চরম শিখরে এসে গেছেন। কিন্তু তার পরেও বরের কোন খোজ মিলছে না। কনের বাবা মঁসিয়ে লরেস্টের মুখে দুশ্চিন্তা আর বিরক্তির ছাপ স্পস্ট। এক সময় বাধ্য হয়ে কনের বাবা তার মেয়ের হবু বরের এক বন্ধুকে জরুরি তলব করে জানতে চাইলেন কী ব্যাপার? এখনও তো তোমার বন্ধু এলো না? পথে কোনো বিপদ হয়নি তো? বিয়ের সব আয়োজন শেষ অথচ বরের খোঁজ নেই? এ কেমন কথা?  

সবাই মিলে শুরু করলো বরের খোঁজ। দু-চার জায়গায় খোঁজ করেও যখন বরের কোনো খোঁজ খবর মিলল না। তখন বরের এক বন্ধু নিজের কাছে প্রশ্ন করলো তার বন্ধু বিয়ের আসরে না এসে কোথায় যেতে পারে? ভাবতে ভাবতে তার মনে হল তার বন্ধু তো ভীষণ কাজপাগল! একবার তার ল্যাবরেটরিতে গিয়ে খোঁজ করলে হয় না? ওখানে থাকলেও তো থাকতে পারে। ঠিক যেমন ভাবা, তেমন কাজ। এবার তার আন্দাজ মোটেই ভুল নয়, সঠিক।  গিয়ে দেখা গেল ল্যাবরেটরিতে একাগ্রচিত্তে কাজ করে যাচ্ছে বর, কাজের চাপে বিয়ের কথা তো ভুলেই গেছে। নিজের কাজ ব্যতীত তার এই বন্ধুটি বাহ্যিক পরিবেশের প্রতি এতই বেখেয়ালি যে, বন্ধুর পায়ের শব্দও তার শ্রবণযন্ত্রে কোনো সারা জাগাতে পারেনি, বন্ধুটি আর সহ্য করতে না পেরে প্রচন্ড রাগে তখন চেঁচিয়ে ওঠেন,আর বলেন যে, আজ না তোর বিয়ে? সবাই অপেক্ষা করছে আর তুই এখানে আপনমনে কাজ করে যাচ্ছিস? প্রত্যুত্তরে বরের জবাব ছিল, বিয়ের কথা আমি ঠিক ভুলে যাইনি, তবে কাজটা শেষ না করেবিয়ের আসরে কিভাবে যাই? বিজ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগী আর সদা কাজ পাগল এই ব্যক্তিটির নাম লুই পাস্তুর।

লুই পাস্তুর কে ছিলেন 

লুই পাস্তুর (ফরাসি: Louis Pasteur লুই পাস্ত্যোর একজন ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ।তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন, অ্যালকোহলজাতীয় পানীয়ের পচনের জন্য অণুজীব দায়ী। জীবাণুতত্ত্ব ও বিভিন্ন রোগ নির্মূলে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছেন বলে তাকে অনুজীব বিদ্যার জনক হিসেবে ধরা হয়। যার সম্বন্ধে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন অকপটে বলেছিলেন,তিনি ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান।

লুই পাস্তুর ১৮২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ক্রিসমাস পর্বের দুদিন পর ফ্রান্সের জুরা প্রদেশের দোল শহরের এক দরিদ্র খৃষ্টান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তিনি বেড়ে উঠেন আরবোয়া শহরের পরিবেশে। তার বাবা নাম ছিল জিন-জোসেফ পাস্তুর এবং মায়ের নাম জ্যানি-এটিয়েনেট রোকি । লুই পাস্ত্যুর তার বাবা মায়ের তৃতীয় সন্তান। 

লুইয়ের বাবা জিন-জোসেফ পাস্তুর প্রথম জীবনে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর একজন সেন্যাধ্যক্ষ ছিলেন। সাধারণত সেনাবাহিনীতে কাজ করা লোক জন তাদের নিজ নিজ দেশ কে খুব ভালবাসে। দেশের জন্য জীবন দিতেও তারা পিছু পা হয় না। এই বিষয়টি সম্ভবত শিশু পাস্তুরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে খুব বেশি প্রভাবিত করেছিল। এ কারনে লুই পাস্ত্যুর বাবার মতোই দেশকে খুব ভালবাসতেন ছিলেন। 

চলচিত্রের ধ্রুব তারাদের নিয়ে আমার লেখা গুলো পড়ে আসতে পারেন

পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর কাজ থেকে অবসর নিয়ে লুই পাস্তুরের বাবা নিজের গ্রামে ফিরে আসেন এবং একটি ছোট ট্যানারি কারখানা গড়ে তোলেন। প্রসঙ্গত লুই পাস্তুর দের গ্রামে কোন স্কুল ছিল না। আর তাকে নিজেদের ট্যানারী কারখানায় নিয়মিত কাজ করতে হত। ট্যানারি কারখানায় কাজ করতে করতে লুই পাস্তুরের মনে হত, যদি সে লেখাপড়ার করার সুযোগ পেত, তবে হয়তো তাকে দুর্গন্ধযুক্ত মরা জীব-জন্তুর চামড়া পরিষ্কার করে দিন যাপন করতে হতো না। অন্যদিকে তার মা এটিয়েনেট  বাগানের মালিনী হিসেবে কাজ করতো। যখন লুইয়ের জন্ম হয় তখন তার বাবা যোসেফ  খুব আনন্দিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে, তিনি পড়াশোনা করতে না পারলেও তার পুত্রকে উপযুক্ত শিক্ষালাভের সব সুযোগ করে দেবেন।  

শিক্ষা ও কর্মজীবন

লুই পাস্তুরের বাবার ট্যানারী ব্যাবসা লাভের মুখ দেখলে তিনি ব্যাবসা আরো বড় করতে শহরের আসে পাসে বাসা পাল্টানোর কথা ভাবেন, এর ধারাবাহিকতায় এক সময়  তার পরিবার ইতিমধ্যে নিজগ্রাম পরিত্যাগ করে করে বেসানকনের কাছে পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করে। আর এতেই লুই পাস্তুরের পড়ালেখা করার সুযোগ আসে। আর তিনি ১৮৩১ সালে পাস্তুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই সময় তিনি বিদ্যালয়ের গৎবাধা পড়াশোনার প্রতি তেমন মনোযোগী ছিলেন না। বরং পড়াশোনার বদলে এ সময় তার বিশেষ আগ্রহের জায়গা ছিল মাছ ধরা এবং স্কেচিং করা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে পাস্তুর বেসানকনের একটি স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকাবার পর ১৮৩৮ সালের অক্টোবরে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে পেনশন বারবেটে ভর্তির উদ্দেশ্যে প্যারিসে চলে যান। 

কিন্তু প্যারিসে এসে লুই পাস্তুর  মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তার কারণ মুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা পাস্তুরকে পারিস শহরের একঘেয়ে জীবনের সাথে মানিয়ে নিতে না পারার অক্ষমতা। নিজের জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি একবার এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “যদি আবার বুক ভরে চামড়ার গন্ধ নিতে পারতাম,হয়ত আমি কয়েক দিনেই আমি সুস্থ হয়ে উঠতাম।”

লুই পাস্তুর প্যারিসের নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারার কারণে নভেম্বরেই প্যারিস ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসেন। এর পর তিনি ১৮৩৯ সালে উচ্চতর ডিগ্রী লাভের উদ্দেশ্যে রয়্যাল কলেজে ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৮৪০ সালে দর্শনশাস্ত্রে ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রী অর্জন করেন। নিজের কলেজেই তিনি একদিকে গণিতে শিক্ষকতার কাজ শুরু করেন, অন্যদিকে বিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জনের জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। এর ঠিক দুই বছর পর ১৮৪২ সালে রসায়নশাস্ত্রে ব্যাচেলর অব সাইন্স ডিগ্রী অর্জন করেন। 

১৮৪২ সালে ইকোল নরমলে সুপারভাইয়ার প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। তিনি প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তবে তার র‌্যাঙ্কিং কম ছিল। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন পরবর্তী বছর আবার পরীক্ষা দেবার। যে প্যারিস ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সেই প্যারিসে তার পুনরাগমন ঘটে। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তিনি পেনশন বারবেটে ফিরে যান। ১৮৪৩ সালে ভাল ফলাফল নিয়েই পাস করেন এবং ইকোল নরমলে সুপারভাইয়ারে প্রবেশ করেন। ১৮৪৫ সালে তিনি বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। 

১৮৪৬ সালে টর্নন কলেজ (Collège de Tournon)-এ পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে পাস্তুরের অন্যতম প্রিয় একটি বিষয় ছিল রসায়ন। তিনি এই সময় পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৮৪৭ সালের মধ্যে তিনি তার দুটি থিসিস জমা দেন, একটি ছিল রসায়নে এবং অন্যটি পদার্থবিদ্যায়। কিছুদিন ডিজন লাইসিতে (Dijon Lycée) পদার্থবিদ্যায় অধ্যাপনা করার পরে ১৮৪৮ সালে স্ট্র্যাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে অধ্যাপনা করার ডাক পান। এই প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করেন পাস্তুর। লুই পাস্তুরের সুপ্ত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে একবার তার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুই পাস্তুর কে নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, লুই একদিন একজন কৃতী শিক্ষক হবেন, আর হয়েছিলও তা-ই।

সৃজনশীল ব্লগ কালাক্ষর এ আমার লেখা পুরাতন পোষ্ট গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংক গুলোতে ক্লিক করুন 

স্ট্র্যাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর মঁসিয়ে লরেস্টের বাসায় লুইপাস্তুরের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ১৮৪৯ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেন মঁসিয়ে লরেস্টের ২৩ বছর বয়সী ছোট মেয়ে মেরি লরেন্তেকে। যার সাথে বিয়ের দিনের ঘটনা আমি লেখার শুরুতে বলেছি। যাই হউক,মেরি লরেন্ত তার স্ত্রী হিসেবেই শুধু যোগ্যই ছিলেন না, ছিলেন একজন যোগ্য সহচরী। বিজ্ঞান-তপস্বী স্বামীর সাধনায় মেরি লারেন্তে নিজেকেও যুক্ত করেছিলেন। এ কারনেই পাস্তুর তার নিজ স্ত্রী সম্পর্কে গর্ব করে বলতেন, একজন স্ত্রী হবার জন্য যত গুণাবলী দরকার তার সবই আমি মেরি লরেন্তের ভিতর তার সব টাই খুঁজে পাই। লুই পাস্তুর আর মেরি লরেন্ত  দম্পত্তির ঘর আলো করে  পরবর্তি কালে জন্ম নেয় পাঁচ সন্তান,কিন্তু পাচ সন্তানের মধ্যে তিনজন শৈশবে টাইফয়েডের কারণে মারা যায়। প্রিয় সন্তানদের এভাবে মৃত্যু হওয়া তিনি মন থেকে মেনে নিতে পানেন নি, তাই তিনি টাইফয়েড রোগের প্রতিকারের জন্য মনোনিবেশ করেন। 

মানব কল্যাণে পাস্তুরের কৃতিত্ব

 মানব কল্যানে বিজ্ঞানের গবেষণায় নিজেকে উৎসর্গ করা বিজ্ঞানীদের মধ্যে লুই পাস্তুর অন্যতম। সময় টি ছিল ফ্রান্স আর তার প্রতিবেশী দেশ জার্মানীর চরম বৈরি কাল। ঐ সময় দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের (ফ্রান্স ও জার্মানি) রাষ্ট্রপ্রধানরা যখন পরস্পরকে শত্রু বিবেচনা করে একে অন্যের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দিতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে একে অপরের ক্ষতি সাধন করতে ব্যাস্ত। ঠিক তখন এই মহান বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর দিন রাত এক করে, মানবজাতির কল্যাণে বিজ্ঞান গবেষণায় নিজেকে মগ্ন রেখেছিলেন। তার আবিষ্কার কখনো বাঁচিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানব প্রান, আবার কখনো বা পুনরুদ্ধার করেছে কোন ব্যাবসায়ীর প্রায় ডুবতে বসা কোন ব্যবসার মূলধন । চলুন, জেনে আসা যাক মহান বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের যুগান্তকারী কিছু আবিষ্কার সম্বন্ধে   

মদ শিল্প লুই পাস্তুরের অবদান

লুই পাস্তুর মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে লিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের ডিন এবং প্রধান অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। সে সময় ফ্রান্সের লিলের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠা অসংখ্য মদ তৈরির কারখানায় তৈরি মদের বিশ্বব্যাপী বেশ খ্যাতি ছিল। কিন্তু ওই সময় ফ্রান্সের মদ বেশি দিন খাবার উপযোগী থাকতো না। তৈরির  কিছুদিনের মধ্যেই মদের গুনাগুন নষ্ট হয়ে যেত। এর ফলে  শুধুমাত্র মদ ব্যবসায়ীরাই নয়, মোটা অনেকের রাজস্ব হারাবার ফলে প্রত্যক্ষভাবে ফ্রান্স সরকার ও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল।

এই জন্য মদ নষ্ট হবার কারণ অনুসন্ধান এবং এর প্রতিকারের দায়িত্ব এসে বর্তায় লুই পাস্তুরের উপর। লুই কঠোর পরিশ্রম করে এই দায়িত্বে সফলকাম  হন।

লুই পাস্তুর মদ নষ্ট হবার জন্য দায়ী একধরনের ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া খুজে বের করলেন এবং এই ব্যাক্টেরিয়া সমস্যা হতে পরিত্রাণের উপায়ও বের করে ফেলেন। তিনি ক্ষতিকর জীবাণু নষ্ট করতে মদকে  ১২০° ফারেনহাইট তাপমাত্রায় গরম করার পাস্তুরাইজেশন  (Pasteurization) সুত্র আবিস্কার করে ফেলেন । এর ফলে  ফ্রান্সের লক্ষ লক্ষ টাকার মদের ব্যবসা রক্ষা পায়। লুই  পাস্তুরের এই যুগান্তকারী পাস্তুরাইজেশন  (Pasteurization) সুত্র ব্যাবহার করে পরবর্তীতে বহুজন চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নের জন্য কাজে লাগিয়েছেন।

রেশম শিল্পে লুই পাস্তুরের অবদান

সেকালে ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান একটি শিল্প ছিল রেশম শিল্প। কিন্তু কোনো এক অজানা রোগে হাজার হাজার গুটিপোকা নষ্ট হচ্ছিল। এই নিয়ে গবেষণাও কম হয়নি। তবে কেউ এর কারণ বা প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে যখন পারছে না তখন ফরাসি সরকারের শেষ ভরসার মানুষ লুই পাস্তুর কে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

টানা তিন বছর নিরবচ্ছিন্ন ভাবে দিনে টানা আঠারো ঘণ্টা কাজ করে লুই পাস্তুর এই রোগের কারণ ও সমাধান দুই-ই আবিষ্কার করে ফেললেন। পাস্তুর লক্ষ্য করেন, রেশম পোকার এই সমস্যাটি একটি বংশগত সমস্যা অর্থাৎ  রেশমের মা মথ  থেকে পরবর্তী মথের বা প্রজন্মে সংক্রামিত হয়। তাই তিনি রোগমুক্ত রেশমের গুটি বাছাই করার প্রস্তাব দ্যান। 

তার এই সিদ্ধান্তে তখন ফ্রান্সে বেশ  ঠাট্টা-বিদ্রূপ শুরু হয়েছিল কিন্তু  লুই পাস্তুর ছিলেন তার সিদ্ধান্তে অটল। এবং যার সুফল সেই বছরই ফ্রান্সের রেশম চাষীরা পেয়েছিল। লুই পাস্তুর অমানুষিক পরিশ্রমের বিনিময়ে যৎসামান্য পারিশ্রমিক লাভ করলেও এ বিষয়ে তার কোনো অভিযোগ ছিল না, দুর্দিনে দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছেন এতেই তার ছিল আত্মতৃপ্তি। 

লুই পাস্তুরের জীবাণু তত্ব

১৮৬৭ সালে পাস্তুর সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের প্রধান অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে জীবাণু তত্ত্ব (Bacteriology) নিয়ে তার গবেষণা শুরু করেন। লুই পাস্তুর তার তত্ত্বে দেখান যে, অণুজীব দ্বারা কিছু রোগ সংঘটিত হয় এবং সেগুলো পানি ও বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে। তার এই তত্ত্বের মূল কথা ছিল, অনুজীব কোনো বৃহদাকার জীবের শরীরে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

পোল্ট্রি শিল্পে লুই পাস্তুরের অবদান

ফ্রান্সে মুরগির মধ্যে ব্যাপক আকারে কলেরা রোগ ছড়িয়ে পড়ে। খুব স্বল্প সময়ে তা মহামারি আকারে পার্শ্ববর্তী ফার্মে ছড়িয়ে পড়তো। এতে পোলট্রি ব্যবসা বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হতে থাকে। লুই পাস্তুর এই বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানের কাজ শুরু করে দেন। 

গবেষণা করতে গিয়ে লুই পাস্তুর বুঝতে পারলেন অ্যানথ্রাক্স ব্যাসিলি নামক এক প্রকার জীবাণু মুরগীর এই কলেরা মহামারির জন্য দায়ী যাকে অ্যানথ্রাক্স (Anthrox) রোগ নামে আখ্যায়িত করা হয়। লুই পাস্তুর এই এন্থ্রক্স রোগের প্রতিষেধকও আবিষ্কার করে ফেলেন। এসময় লুই পাস্তুর কিছু নিষ্ক্রিয় অ্যানথ্রাক্স (Anthrox) রোগের জীবাণু ভেড়ায় মাধ্যমে প্রবেশ করিয়ে দেখতে পান যে, নিষ্ক্রিয় অ্যানথ্রাক্স (Anthrox) রোগের জীবাণু গুলো পরবর্তীতে আর রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম জীবাণু দিয়ে সংক্রমিত হয় না। আর এতেই বেঁচে যায় ফ্রান্সের পোল্ট্রি শিল্প।  

হাইড্রোফোবিয়া বা জলাতঙ্ক

অ্যানথ্রাক্সের প্রতিষেধক আবিষ্কারের পরে পাস্তুর হাইড্রোফোবিয়া বা জলাতঙ্ক নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। তার জীবনে করা শ্রেষ্ঠ গবেষণা ছিল এটি। হাইড্রোফোবিয়া বা জলাতঙ্ক ছিল সে যুগের এক আতঙ্কের নাম। কোনো মানুষকে পাগলা কুকুর কামড়ালে অধিকাংশ সময়েই সেই ক্ষত কিছুদিনেই মধ্যেই শুকিয়ে যেত। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরেই প্রকাশ পেত হাইড্রোফোবিয়া বা জলাতঙ্কের লক্ষণ। অনেকেই এই রোগ নিয়ে গবেষণা করছিলেন, কিন্তু কেউ তখন পর্যন্ত সফল হতে পারেননি। তিনি আবিষ্কার করেন জলাতঙ্ক আক্রান্ত কোনো পশু স্পাইনাল কর্ডের নির্যাসের মাধ্যমে অপর কোনো প্রাণীকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত করতে সক্ষম। তিনি প্রাণীদেহে রোগ তৈরিতে অক্ষম এমন কিছু জলাতঙ্ক ভাইরাস উৎপাদন করে তা পশুর দেহে প্রয়োগ করেন এবং অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেন। 

সৃজন শীল বাংলা ব্লগ কালাক্ষর এ আমার আগের লেখা গুলো পড়তে নিচের লিংক গুলোতে ক্লিক করুন 

এবার মানুষের শরীরে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা বাকি ছিল। পাস্তুর সেই সুযোগটাও পেয়ে যান। একজন ছেলেকে তার মা পাস্তুরের গবেষণাগারে নিয়ে আসে। ছেলেটিকে জলাতঙ্ক আক্রান্ত একটি কুকুর কামড়িয়েছিল, পাস্তুর বুঝলেন ছেলেটি আর বেশিদিন বাঁচবে না। অবশেষে পাস্তুর তাকে টিকা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে ছেলেটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে পাস্তুরের এই অবিস্মরণীয় আবিষ্কারের কথা।

দেশপ্রেমিক পাস্তুর 

দেশের প্রতি লুই পাস্তুরের মনে ছিল গভীর ভালোবাসা। জার্মান বাহিনী ফ্রান্স আক্রমণ করলে তিনি ফ্রান্সের সেনাদলে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু অমানবিক শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের কারণে তিনি ফ্রান্স সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারেননি। যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে না পারলেও জার্মান বাহিনীর আগ্রাসন কিছুতেই মুখ বুজে সহ্য করতে পারেননি তিনি। 

জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব মেডিসিন উপাধি প্রদান করেছিল। কিন্তু ফ্রান্সে জার্মান বাহিনীর আগ্রাসনের নিন্দাস্বরূপ তাকে দেওয়া উপাধি গ্রহণে অসম্মতি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেন।

 তিনি মানবকল্যাণে নিয়মিত কাজ করে পরিশ্রম করে গেছেন, বিনিময়ে খুব স্বল্পই নিয়েছেন। কিন্তু লোকমুখে এমনও কথা প্রচলিত আছে যে, এক জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ফ্রান্সের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল, শুধুমাত্র লুই পাস্তুরের অ্যানথ্রাক্স রোগের প্রতিষেধক ফ্রান্সকে তার থেকে বেশি অর্থ এনে দিয়েছিল। অথচ লুই শুধু নিজ দেশের দুর্দিনে কিছু করতে পেরেছিলেন- এটাই ভেবে সন্তুষ্ট ছিলেন। 

তৃতীয় নেপোলিয়নের দরবারে সম্রাট পাস্তুরের কাছে তার পারিশ্রমিক সম্পর্কে জানতে চান। তার উত্তরে সম্রাট আশ্চর্য হয়ে এত বেশি পরিশ্রম করে, এত কম পারিশ্রমিক নেওয়ার কারণ জানতে চান। সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে তার জবাব ছিল অনেকটা এমন, “একজন বিজ্ঞানী কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য কাজ করে না।”

আমাদের জন্য খুব পরিতাপের বিষয় মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা এই বিজ্ঞানী সম্পর্কে আমরা খুব সামান্যই জানি। ফ্রান্সের একজন শ্রেষ্ঠ সন্তানের সত্তরতম জন্মদিনে ফ্রান্স সরকার জাতীয় ছুটি ঘোষণা করে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত সকলের উদ্দেশ্যে সরবনের সেই আনন্দ অনুষ্ঠানে নিরহংকার, সরল, সাদাসিধে মনের লুই পাস্তুরের ভাষ্য ছিল,

আমি সমস্ত জীবন ধরে বিশ্বাস করেছি, একমাত্র বিজ্ঞান আর শান্তির চেতনাই পারে সমস্ত অজ্ঞতা আর যুদ্ধের বিভীষিকাকে দূর করতে। বিশ্বাস করুন, একদিন সমস্ত দেশই সম্মিলিত হবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তি-সহযোগিতার পক্ষে থাকবে; আর সেই ভবিষ্যৎ হবে বর্বরদের নয়, শান্তিপ্রিয় মানবজাতির।

শারীরিক অসুস্থতা এবং মৃত্যু

লুই পাস্তুর ১৮৬৮ সালে  এক গুরুতর স্ট্রোকের শিকার হন। এ যাত্রায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান বটে, তবে তার দেহের বাম সাইড পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে যায় । এই দফায় লুই পাস্তুরের ভাগ্য সহায় থাকায় ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। 

কিন্তু ১৮৯৪ সালের দিকে আবার একটি স্ট্রোক হবার ফলে লুই পাস্তুরের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায় । নিষ্ঠা সাথে কর্মমগ্ন থাকা মানুষটির শারীরিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হতে হতে ১৮৯৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসের নিকটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নটরডেম ক্যাথেড্রালে চির নিদ্রায় শায়িত হন বিজ্ঞান-তপসী লুই পাস্তুর। তার দেহাবশেষ প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরিত করা হয়।

Reference:

(1) Robbins, Louise (2001). Louis Pasteur and the Hidden World of Microbes. New York: Oxford University Press. p. 15.
(2) Louis Pasteur
(3) Louis Pasteur: Biography & Quotes 
(4) Louis Pasteur 
(5) Pasteur, France’s first media scientist
(6) Humanity’s Debt to Pasteur 
(7) মাইকেল এইচ. হার্ট। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী। পৃষ্ঠা: ৫৫

Exit mobile version