Site icon কালাক্ষর

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস: করনা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তির সাথে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সম্পর্ক কি? কেনবা এরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন?

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস: করনা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তির সাথে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সম্পর্ক কি? কেনবা এরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন?

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের প্রতীকী ছবি । Image Courtesy: The New Indian Express

জ্ঞ্যান বিজ্ঞানের আলোকে সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় আমরা যখন এর সর্বচ্য শিখড়ে আহরণ করছি, ঠিক তখনই আমাদের ঘরের দরজায় মৃত্যু বার্তা নিয়ে করনা নামক এক মহামারী হাজির হয়েছে।মান সম্পন্ন প্রতিষেধক আবিস্কার করা এখনো সম্ভব হয়নি বলে ঠিক মত প্রতিকার করাও সম্ভবপর হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে এই মহামারী প্রতিরোধের অংশ হিসেবে লক ডাউনের নামে আমরা সেচ্ছায় গ্রহণ করে নিয়েছি গৃহবন্দিত্ব। নিজ ঘড়ে বন্দি থাকার পরেও সারাক্ষণ মৃত্যু ভয় তাড়িয়ে ফেরে আমাদের। এর প্রভাবে গত দেড় বছরে তাই পৃথিবীর সমাজ ব্যাবস্থা আর সামাজিকতা বদলে গেছে অনেক খানি,এক সময় যে বন্ধুর দেখা পেলে বুকে আড়কে ধরতাম এখন আমরা তাকে দেখলে করনা সংক্রমণের ভয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। এই করনা এসে আমাদের বাজার ব্যাবস্থাপনা বদলে ফেলেছে, উৎপাদন ব্যাবস্থাপনা বদলে দিয়েছে, স্থবির করে দিয়েছে আমাদের অর্থনিতি। আর এর ধারাবাহিকতায় আমাদের চিরচেনা এই পৃথিবী আর আগের মতো নেই। এর ভিতরেও আমরা আসতে আসতে এর সাথেই আমরা এমনভাবে মানিয়ে নিয়েছি যেন এটাই স্বাভাবিক, এমনই হবার কথা ছিল! তাই না?

করনা মহামারীর এই প্যান্ডামিক এই সময়টিতে সৃষ্ট এ সংকট নিরসনে সর্বস্তরের মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছিল।  এর ধারাবাহিকতায় প্রথম করনা মহামারীর ঢেউ মোকাবিলা করে,যখন দৈনন্দিন জীবন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠা শুরু করতেছিল ঠিক সেই সময়টিতেই শুরু হল করোনাভাইরাসের ‘দ্বিতীয় প্রকোপ’। তবে সে এবার একা আসেনি, সাথে নিয়ে এসেছে ভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট আর এক রোগ। সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে ইতোমধ্যেই সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠা ছত্রাকঘটিত বিরল রোগটি; ব্ল্যাক ফাঙ্গাস, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যা ‘মিউকরমাইকোসিস’ নামে বিশেষ ভাবে পরিচিত। গবেষক দের মতে ‘মিউকরাল’ বর্গের অধীনে থাকা সকল ছত্রাকই ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগের কর্ণধার। তবে ভারতে যারা ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত রোগীদের নমুনা পরীক্ষার পর জানা গেছে তথাকথিত  ‘মিউকরাল’ বর্গের অন্তর্ভুক্ত ছত্রাক গুলোর ভিতরে কেবলমাত্র ‘মিউকর’ নামক প্রজাতির সন্ধান মিলেছে।

সৃজন শীল বাংলা ব্লগ কালাক্ষর এ আমার আগের লেখা গুলো পড়তে নিচের লিংক গুলোতে ক্লিক করুন 

যদি আপনি ব্ল্যাক ফাঙ্গাসকে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট সাথে করে নিয়ে এসেছে– কথাটা এই ভাবে ভাবেন তবে তা এক অর্থে ভুল হবে। কারণ বর্তমানে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ডায়রিয়া হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, ডাইরিয়ার চিকিৎসা নিয়েও চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু  যদি দেখা যায় একটি এলাকায় অবস্থানরত সবাই একসাথে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে? তখন কি হবে? তখন আক্রান্ত সবাইকে জনে জনে চিকিৎসা দিয়েই শুধু এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। সেই সাথে খুঁজে বের করতে হবে সেই এলাকায় ঘটা এমন কিছু জিনিস যা ডায়রিয়াকে পুরো এলাকায় ট্রিগার করেছে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমানাধীন বহু পুরনো এক রোগ। আর এর সমাধান করতে হলে কেবল ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের চিকিৎসা যথেষ্ট হবে না, আরও গভীরে পৌঁছাতে হবে আমাদের।

ছত্রাকঘটিত রোগসমূহের জ্ঞানের পরিধি আমাদের কাছে দেহের বিভিন্ন অংশে চুলকানি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তবে এর বাইরেও ছত্রাক জগতে রয়েছে বহু অবাক করা ব্যাপার। পূর্বে ছত্রাককে উদ্ভিদজগতের সাথেই আলোচনা করা হতো, উদ্ভিদের মতো স্বভোজী না হওয়ায় একে পরবর্তীতে আলাদা করে স্থান দেয়া হয় ফাঙ্গাস তথা ছত্রাক জগতে।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস। Image Courtesy: The New Indian Express

নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে সক্ষম নয় এরা, ফলে খাদ্যের জন্য নির্ভর করতে হয় অন্যের উপর। ছত্রাককে আঙ্গিক দিক থেকে বিবেচনায় আনা হলে দু’ধরনের ছত্রাকের দেখা মেলে- ঈস্ট ও মোল্ড। ঈস্ট হলো এককোষী ছত্রাক, আর মোল্ড বহুকোষী। আবার কিছু ছত্রাক এমনও রয়েছে যারা তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের দেহেও পরিবর্তন আনতে সক্ষম। দ্বি-চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত এ ছত্রাকগুলো পোষকদেহের বাইরে মোল্ড হিসেবে এবং পোষকদেহের ভেতরে ঈস্ট হিসেবে অবস্থান করতে পারে। আমাদের আলোচ্য ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের জন্য দায়ী মিউকর একটি মোল্ড। এর জীবনযাপন পদ্ধতি যদি আমরা লক্ষ্য করি, তাহলে খুব সহজেই বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতির সাথে এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব। 

ছত্রাক সাধারণত মাটিতে মৃত বস্তুর সারাংশ ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে,এবং উপযুক্ত পোষকদেহ পেলে পোষককোষ থেকেও পুষ্টি আহরণে সক্ষম হয়। তবে জেনে রাখা ভাল ছত্রাকের আক্রমণের এ পরিধি যে শুধু মাত্র পোষকদেহের ত্বক পর্যন্তই বিস্তৃত থাকে, তা কিন্তু নয়। পোষকদেহের ভেতরে যে খানেই উপযুক্ত পরিবেশ পাবে সেখানেই ছত্রাক আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। আমাদের দেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা প্রতিরোধ ব্যবস্থার তারতম্য এর সাথে ছত্রাকের আক্রমণের উপযুক্ত পরিবেশের মাপ কাঠি নিরুপিত হয়।

বিষয়টি এমন, এক শ্রেণির পরজীবীই রয়েছে যারা সুবিধাবাদী ভূমিকা পালন করে। এরা সর্বত্রই বিরাজমান থাকে, কিন্তু পোষকদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারে না বিধায় এরা সেখানে নম্র, ভদ্র, অক্ষতিকর হিসেবে অবস্থান করে থাকে। তেমনি সুযোগের অভাবে সৎ থাকা বেশ কিছু সুবিধাবাদী ছত্রাকও রয়েছে এ তালিকায়। মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী সুবিধাবাদী ছত্রাকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে এগুলোর মাঝে অন্যতম আমাদের আলোচ্য ‘মিউকরমাইকোসিস’-এর জন্য দায়ী ‘মিউকর’ ছত্রাকটি।

এইডসে আক্রান্ত হবার ফলে মানব দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ে, এইডস আক্রান্ত মানুষটির দেহে তখন চারপাশ থেকে এ সমস্ত সুবিধাবাদী পরজীবীগুলো এসে বাসা বাঁধতে শুরু করে দ্যায়।  সামান্য জ্বর, সর্দি, কাশিই ধীরে ধীরে রোগীটিকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যায়। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের ক্ষেত্রেও ব্যাপার টিও তেমনটি। পোষকদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর হবার দরুণ মিউকর ছত্রাকটি সুযোগ পেয়ে যায় ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগ সৃষ্টির।

ছত্রাক সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক একজন মানুষকেও আক্রমণ করতে পারে কিন্তু এক জন সুস্থ এবং স্বাভাবিক মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে বলে ছত্রাক গুলো তার দেহে খুব দ্রুততার সাথে বিস্তার ঘটাতে পারে না। কিন্তু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যদি কোনো মানুষের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় অথবা বিনষ্ট হয়, তখন সেই মানুষটির দেহে ছত্রাক তার দ্রুত বংশ বিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ পায়।  যেমন- এইচআইভি ভাইরাসের আক্রমণে সময়ের সাথে একজন মানুষের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসার কথা পুর্বেই বলেছি। শুধু তাই নয় যখন কারো জীবন বাঁচাতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়, তখন ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে সেই মানুষের দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে রাখার প্রয়োজন পড়ে, কেন এমন করা হয় যদি জানতে চান তবে বলি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকলে কারো দেহে প্রতিস্থাপণ করা অঙ্গকেই সেই ব্যাক্তির দেহের রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফরেন পার্টিকেল হিসেবে মনে করে এবং তা ধ্বংস করতে উঠে-পড়ে লাগে। শুধু মাত্র এই কারণে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীকে যখন কেমোথেরাপী দেয়া হয় কিংবা স্টেম সেল থেরাপী দেওয়ার প্রয়োজন পরে,ফলে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর দেহের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা কমে আসে। আর এসমস্ত করনে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর দেহে ছত্রাক আসলে,তারা মিউকর করার সুযোগ পেয়ে যায় যা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগ সৃষ্টি করে। 

ইন্ডিয়ার ব্ল্যাক ফাঙ্গাস আক্রান্তদের একটি ইউনিট -thenewsminute.com

বিরল ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগে কেউ আক্রান্ত হলে প্রাথমিক পর্যায়ে বোঝার উপায়ই থাকে না যে, তিনি মিউকরমাইকোসিস-এ আক্রান্ত। আর এটি এতটাই মারাত্মক যে, খুব অল্প সময়ের ভেতরেই মৃত্যুর দুয়ারে টেনে নিয়ে যেতে পারে পোষককে। হিসেব খুবই সহজ, একজন সুস্থ ব্যক্তির দেহে মিউকর ছত্রাকটি বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারে না। কিন্তু যার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আগেই কমতে কমতে অকেজো হবার পর্যায়ে আছে বা অকেজো হয়ে গেছে, সেই সব মানুষের দেহে ছত্রাকের মিউকরকে নিজের বিস্তার নিয়ে আর বিশেষ বেগ পেতে হয় না।

ছত্রাক একটি পোষকদেহের কোথায় আক্রমণ করবে, তা নির্ভর করে ছত্রাকটির প্রবেশপথের উপর। যদি ছত্রাক জীবাণুটি বাতাসের মাধ্যমে পোষকের নাকে বা মুখে প্রবেশ করে, তবে জীবানুটি আস্তানা গাড়বে পোষকের শ্বসনতন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট অংশে; তা পোষকের নাসারন্ধ্রও হতে পারে, আবার নাকের সাইনাসে, শ্বাসনালী কিংবা ফুসফুসেও হতে পারে। অর্থাৎ সে পোষক দেহের যেখানে সুবিধা করতে পারবে সেখানেই আস্তানা গেড়ে নেবার পরের ধাপেই শুরু করবে তার বিস্তার। রক্তনালীতে আক্রমণে সক্ষম হবার দরুণ খুব সহজেই রক্তের মাধ্যমে অন্যত্র পরিবাহিত হতে পারে মিউকর।

অনেক সময় জীবানুটি নাক থেকে খুব সহজেই ছত্রাকটি ফুসফুসের দিকে অথবা সাইনাস আর চোখ হয়ে মস্তিষ্কে বিস্তৃত হতে পারে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দ্বিতীয় ঘটনাটি, অর্থাৎ সাইনাস থেকে চোখ হয়ে মস্তিষ্কে বিস্তারের ব্যাপারেই জানা গিয়েছে; চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় রাইনোসেরেব্রাল মিউকরমাইকোসিস। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস কিংবা কিডনী প্রতিস্থাপনজনিত জটিলতায় মানুষের এই ধরনের ব্ল্যাক ফাঙ্গাস হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। এছাড়াও ছত্রাক টি ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে ফুসফুসে এবং নবজাতক শিশু যাদের  দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই কম থাকে বলে এদের পরিপাকতন্ত্রেও আক্রমণ করে তাদের তান্ডব চালায়। ছত্রাকটির  ত্বকের কোথাও কেটে গেলে সেখান দিয়ে কোন সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশে্র সক্ষমতা আছে।তাই যত দ্রুত সম্ভব পভিডন-আয়োডিন বা স্যানিটাইজার দিয়ে ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্তকরণের চেষ্টা করা উচিত।

পরিক্ষায় জানা গেছে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সাথে ডায়াবেটিস রোগের বেশ ভালো যোগ সাদৃশ্য আছে । ডাইবেটিসে আক্রান্ত রোগীর রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়, এমতাবস্থায় রোগীর দেহের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ যদি অম্লীয় (ডায়াবেটিস কিটোএসিডোসিস) হয়ে ওঠে তা ছত্রাকের বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে স্থিমিত করতে থাকে।

সৃজন শীল বাংলা ব্লগ কালাক্ষর এ আমার লেখা পুরাতন লেখা গুলো পড়ার জন্য অনুরোধ রইল 

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আরো একটি চিন্তার বিষয় হলো, স্টেরয়েড থেরাপী। হাতুড়ে ডাক্তারেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে না বুঝে সকল রোগেই স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এই স্টেরয়েডের প্রভাবেও দেহে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং প্রতিরক্ষা কার্যক্রম ব্যহত হয়, যার দরুণ দেহে ছত্রাকঘটিত রোগের আবির্ভাব অস্বাভাবিক কিছু নয়। যারা শ্বাসকষ্টজনিত রোগে স্টেরয়েড জাতীয় ইনহেলার ব্যবহার করেছেন, তারা দেখবেন আপনার চিকিৎসক আপনাকে ইনহেলার ব্যবহারের পরপরই মাউথওয়াশ কিংবা পানি দিয়ে কুলি করবার পরামর্শ দিয়েছেন। কেননা ভালোমতো মুখ পরিষ্কার না করা হলে স্টেরয়েডের প্রভাবে মুখগহ্বরে ছত্রাকঘটিত রোগ ক্যান্ডিডিয়াসিস হতে পারে। এছাড়া রক্তে প্রয়োজনের তুলনায় অত্যধিক মাত্রায় আয়রনের উপস্থিতিও ছত্রাকের বৃদ্ধির জন্য সহায়ক।

এখন আমরা জানব, কেনইবা কোভিড-১৯ বা করনা থেকে সদ্য সুস্থ হওয়া মানুষ জনেরাই ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হচ্ছেন? কারণ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে না। করোনাভাইরাস শ্বসনতন্ত্রে উপস্থিত প্রতিরক্ষা আবরণ মিউকাস ঝিল্লী ও রক্তনালীগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে রাখে আগে থেকেই। আর লোহিত কণিকার ভাঙনে রক্তে আয়রনের পরিমাণও বেড়ে যায়। এছাড়াও কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো শুধু যে ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করে তা নয়, শ্বসনতন্ত্রে থাকা আমাদের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকেও ধ্বংস করে, যারা এতদিন আমাদের ক্ষতিকর জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করে এসেছে। আর যদি পূর্ব থেকেই ডায়াবেটিস রয়েছে, এমন কেউ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হন, তবে তার দেহে ছত্রাকের বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বেশি।

মানুষের শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ঘাটতি, রক্তে উচ্চমাত্রার আয়রন,ডায়াবেটিস,  দুর্বল রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা- সবকিছু মিলিয়ে ছত্রাকের বংশ বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই সদ্য কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়া মানুষের দেহে এই সকল উপাদানের ঘাটতি কিংবা উপস্থিতি খুব বেশি পরিমানে থাকে বলে ছত্রাক গুলো দ্রুত বংশ বৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ পায় । সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত কিংবা সদ্য সুস্থ হওয়া একজন ব্যক্তির জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখে বিরল এক ছত্রাকঘটিত রোগের লক্ষণের কথা কারো কল্পনাতেও আসে না। আর তার ফলে যা হয়, ছত্রাকের জীবানূ গুলো তখন তাদের বিস্তার ঘটাতে যথেষ্ট সময় পেয়ে যায়, এবং শেষ মেশ মিউকরমাইকোসিসের মূল লক্ষণ প্রকাশ পায় তখন দেখা যায় যথেষ্ট দেরী হয়ে গেছে।

আপনি যদি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হোন বা না হোন,তার পরেও আপনি যদি আপনার দেহে  নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো উপস্থিতি টের পান, তবে যত দ্রুত পারেন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হউন।

মিউকর ছত্রাকের বিস্তার ঘটে খুবই দ্রুত, আর এই লক্ষণগুলো নিয়ে একজন মানুষ যখন দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, হয়তো ততদিনে অনেকখানি ক্ষতি হয়ে গেছে। যদি চক্ষুকোটর কিংবা চোখে পৌঁছে গিয়ে থাকে, ছত্রাকের বিস্তার রহিত করতে একজন চিকিৎসককে হয়তো রোগীর আক্রান্ত টিস্যু অর্থাৎ চোখ বের করে নিতে হতে পারে। একজন মানুষের জীবন বাঁচানোই তখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা শুধুমাত্র যে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য জরুরি তা নয়। সকলেরই উচিত পরিমিত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা। আর যাদের চিকিৎসায় স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহৃত হয়, তাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। রোগীর দৈহিক অবস্থা বিবেচনায় রেখেই স্টেরয়েড থেরাপীর জন্য একজন মানুষ উপযুক্ত কিনা সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের প্রাথমিক লক্ষন – ইমেজ সোর্স – indiatvnews.com

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছোঁয়াচে নয়। তাই বলে কারো নিশ্চিন্ত হবার কিছু নেই যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস  আপনার-আমার মধ্যমে অন্যের দেহে ছড়াবে না। কারণ মোল্ড জাতীয় ছত্রাকগুলোর বংশবিস্তারের মূল হাতিয়ার হলো স্পোর। আগেই বলা হয়েছে যে, একসময় ছত্রাকগুলো উদ্ভিদজগতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। উদ্ভিদ বীজের কথা ভাবুন, কোনো গাছের বীজ অন্যত্র উপযুক্ত পরিবেশ পেলে মাটিতে অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে আরেকটি উদ্ভিদ জন্ম দিতে সক্ষম, অর্থাৎ বীজের মাধ্যমে উদ্ভিদ প্রজাতিটি বংশবিস্তার করতে পারছে। ঠিক একইভাবে ছত্রাকের স্পোরগুলো বংশবিস্তারে সাহায্য করে, উপযুক্ত পরিবেশে মাটিতে কিংবা কোনো পোষকদেহে অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে একই প্রজাতির ছত্রাক জন্ম দিতে পারে।

ছত্রাকের এই স্পোরগুলো বায়ু বাহিত হয়ে যেকোনো প্রাণীর শ্বসনতন্ত্রে প্রবেশে সক্ষম। প্রানীর দেহে ছত্রাকের এই স্পোরগুলো অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে সুতার মতো দেখতে আণুবীক্ষণিক অঙ্গ সৃষ্টি করে যা হাইফা (বহুবচনে হাইফি) নামে পরিচিত, এরা এদের নিরবচ্ছিন্ন বিস্তার ঘটাতে গিয়ে পোষকদেহকে ধ্বংস করতে শুরু করে। আর এ ধ্বংসের মাধ্যমেই ছত্রাক নিজের পুষ্টি গ্রহণ করে থাকে পোষকদেহ হতে। নাসাগহবরে বিস্তারের কারণে নাকের সাইনাসের অস্থি, মুখমন্ডলের অস্থি, চক্ষুকোটরের অস্থি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। রক্ত সংবহন বন্ধ করে দেয়ায় সেসব জায়গাতে বিভিন্ন টিস্যু পুষ্টির অভাবে মৃত্যুবরণ করতে শুরু করে। আর এসব মৃত টিস্যুই আমরা বাইরে থেকে কালো রঙের দাগ হিসেবে দেখতে পাই। চিকিৎসা শুরু না হলে এভাবেই একসময় মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছায় মিউকর আর পোষকদেহকে ঠেলে দেয় মৃত্যুমুখে।

আপনি হয়ত জানেন না, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সৃষ্টিকারী মিউকর ছত্রাকের স্পোর আমাদের পরিবেশে সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে, আণুবীক্ষণিক হবার কারণে এদের আমরা তা খালি চোখে দেখতে পাচ্ছি না। মাস্কের ব্যবহার যদিও কোভিড-১৯ এর দরুণ বেড়েছে, সবাই সচেতন হতে শিখেছে, কিন্তু মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ছিল বহু আগে থেকেই। তাই সঠিক নিয়মে মাস্ক ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই, এটি ধুলাবাহিত ছত্রাক স্পোর থেকেও আমাদের সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

ছত্রাকঘটিত রোগের চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নির্দিষ্ট ওষুধের ব্যবহার। প্রাণিকোষের কোষ ঝিল্লীতে রয়েছে কোলেস্টেরল, অপরদিকে ছত্রাকের কোষঝিল্লীতে থাকে আর্গোস্টেরল। এখানেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের কারসাজি, ছত্রাকের বিরুদ্ধে কাজ করা ওষুধগুলো এমনভাবেই প্রস্তুত করা হয়েছে যেন কেবলমাত্র আর্গোস্টেরলের উপর কাজ করতে পারে। এ সমস্ত ওষুধ ব্যবহারে তাই পোষকদেহের কোনোরূপ ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না।

অ্যাম্ফোটেরিসিন-বি ড্রাগটি কোষঝিল্লীর আর্গোস্টেরলের সাথে যুক্ত হয়ে পুরো ঝিল্লীই ধ্বংস করতে সক্ষম। অ্যাজল গ্রুপের ড্রাগগুলো তো আরো একধাপ এগিয়ে, ছত্রাকের বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্গোস্টেরল তৈরিই হতে দেয় না এরা। বর্তমানে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের চিকিৎসায় এই দুটোই ব্যবহার করা হচ্ছে, রোগীপ্রতি আট সপ্তাহ অ্যান্টিফাঙ্গাল থেরাপীর লক্ষ্যে ভারতে তাই এই ড্রাগগুলোর উৎপাদনের পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি যেহেতু বাংলাদেশেও ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের রোগী পাওয়া গেছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিত বড় আকারে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস চিকিৎসার প্রস্তুতি রাখা।

White Fungus & Black Fungus: Difference in symptoms,, Image Source : FREEPIK

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নিয়ে আপনার মনে একটা প্রশ্নের উদয় হতে পারে তা হল কোভিড-১৯ ভাইরাস আক্রমণের ‘দ্বিতীয় প্রকোপ’ এর সময় টিতেই কেন ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সবার মাঝে আবির্ভূত হলো? ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের এই আক্রমণ  করনার প্রথম ঢেউ বা একদম শুরু থেকে কেন দেখা যায়নি? এর ব্যাখ্যা সু স্পস্ট ভাবে কেউ ই দিতে পারে নি, তবে সবাই ধারণা করেছেন, করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টটি হয়তো মানবদেহে গ্লুকোজের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে সক্ষম। তবে এটা কেবল মাত্র একটি ধারণা মাত্র, এখনো তা নিশ্চিত করে কাউকে ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায় না। এমন ও হতে পারে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় থাকা অক্সিজেন সিলিন্ডার কিংবা পাইপগুলোতে ছত্রাক জন্মেছে। আসলে এর নিশ্চিত উত্তর জানতে হলে আক্রান্তদের মাঝে পর্যাপ্ত তথ্য- উপাত্ত সমৃদ্ধ এপিডেমিওলজিক্যাল স্টাডি হওয়া প্রয়োজন, যা এত অল্প সময়ে সম্ভব নয়।

রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করা সর্বত্তম। তাই আসুন আমার ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানি, নিজে সচেতন হই,এবং এই পোষ্ট শেয়ার করে অন্যকেও সচেতন করতে সহায়তা করি। ধন্যবাদ। সবাই ভাল থাকবেন।

This is a detailed work on the recent phenomenon ‘Mucormycosis’ aka Black Fungus, which has been diagnosed among the patients recovered from COVID-19.

References:

  1. Lippincott’s Illustrated Reviews of Microbiology – 3rd Edition, Page No: 212
  2. Review of Medical Microbiology & Immunology – 14th Edition, Page No: 397-398, 400, 414, 419
  3. Other references are hyperlinked inside the article.

Featured Image By: newindianexpress.com

Exit mobile version