1. sjranabd1@gmail.com : S Jewel : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
ওথেলো সিনড্রোম: ভালোবাসা, সন্দেহ, অবিশ্বাস থেকে যার জন্ম - কালাক্ষর
রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ০৬:৪৫ অপরাহ্ন

ওথেলো সিনড্রোম: ভালোবাসা, সন্দেহ, অবিশ্বাস থেকে যার জন্ম

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১
ওথেলো সিনড্রোম
মডেল - সামিরা খান মাহি। ছবি- ফেসবুক

O, beware, my lord, of jealousy;
It is the green-eyed monster, which doth mock
The meat feeds on”
William Shakespeare, Othello

ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার ভয় পাওয়াটা মানুষের জীবনে সহজাত প্রবৃত্তির ভিতর একটি। যেখানে ভয় নেই সেখানে রোমান্স নেই, যে খানে রোমান্স নেই সেই খানে ভালবাসা হয় পানসে এক ব্যাপার মাত্র, তাই প্রতিটি ভালবাসার সম্পর্কে কিছুটা ভয়, কিছুটা সন্দেহ, কিছুটা “ও শুধু আমার, অন্য কারো নয়” জাতীয় আবেগীয় পাগলামি সম্পর্ক গুলোকে আরো মিষ্টি ও সুন্দর করে তোলে। তবে তা নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত সহনীয়। কারণ এই ভয় আর সন্দেহ যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখনই নেমে আসে মানসিক কিংবা শারীরিক নিপীড়নের খড়গ, যা ভয়ের কারণ বৈকি! আর এই সব কিছু মিলিয়ে যে জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সৃষ্টি হয় সেটাই ওথেলো সিনড্রোম। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে জন টোড নামক একজন ব্রিটিশ মনস্তত্ত্ববিদ এই সমস্যাকে ওথেলো সিনড্রোম হিসেবে অভিহিত করেন। আজ তাহলে ওথেলো সিনড্রোম সম্পর্কে দুই-চারটি কথা জেনে নেয়া যাক।

ওথেলো এবং শেক্সপীয়ার

বিখ্যাত ইংরেজ কবি উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের বিখ্যাত ট্রাজেডি ‘ওথেলো’ নাটকের গল্পের শুরুটা হয়েছিল ইতালির ভেনিস শহরে।  ভালোবাসা, অবিশ্বাস, সন্দেহ, খুন, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিশোধ, অনুতাপ- কী নেই এই নাটকে! ওথেলো অন্যের প্ররোচনায় তার প্রিয়তমা স্ত্রী ডেসডিমোনাকে অবিশ্বাস করতে শুরু করে, পরকীয়ার দায়ে  ডেসডিমোনাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজ হাতে খুন করে। সবশেষে ওথেলো যখন নিজের ভুল বুঝতে পারে তখন আর কিছু করার থাকে না। তাই শেষ মেষ ওথেলো নিজেও আত্মহননের পথ বেছে নেয়। সেক্সপিয়ার রচিত নাটক ওথেলো তে দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র ওথেলো আর ডেসডিমোনার মধ্যে ভালোবাসার অভাব কখনো ছিল না বরং সাধারণের ভালবাসার চেয়ে প্রচুর বেশিই ছিল। কিন্তু প্রচণ্ড ভালোবাসা ও যে কখনো কখনো সম্পর্কের মাঝে বিচ্ছেদের দেওয়াল তুলে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যায়, এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ বোধহয় ওথেলো নাটকের গল্পের ভিতর দেখা যায়। 

 ওথেলো সিনড্রোম

Image Source: openlibrary.org

কেউ ওথেলো সিনড্রোম এ ভুগছেন কি না তা কীভাবে নিশ্চিত হবেন?

কেস-১

আবির ও শায়লা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে। তাদের দুই জনের ভিতর ভর্তির প্রথম সেমিস্টার থেকেই মন দেওয়া নেওয়া শুরু হয়। তাদের ভালবাসা নিয়ে কারো কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পরেও রাত্রে যদি কোন কারণে আবিরের ফোন এক মিনিট ওয়েটিং থাকে। কোন কারণে আবির ফোন না ধরে লাইন কেটে দ্যায় ডাইরেক্ট শায়লা আবিরের হোস্টেলে এসে সবার সামনে চিল্লাফাল্লা করে। এই নিয়ে শুরু হয় তুলকালাম কান্ড।   

কেস-২

৫০ বয়সের এক মাঝ বয়সী তার ৪৩ বছরের  স্ত্রীকে পরকীয়ার অজুহাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। কোনো কাজে ঘরের বাইরে গেলে গোপনে তার উপর নজরদারি করতেন এবং স্ত্রী ঘরে ফিরে এলে তাকে কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল, কার সাথে গিয়েছিল এই ধরনের নানা প্রশ্ন করে জেরা করা ছিল তার রুটিনমাফিক কাজ। এমনকি স্ত্রীকে প্রতিবেশী কারো সঙ্গে মিশতেও  দিতেন দিতেন না।

কেস-৩

অপুর্ব ও নিধি একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করার কিছুদিন পর থেকেই নিধি বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বামী অপুর্বকে নানা রকমের বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকে। অফিসের নারী কলিগের সাথে  অপুর্বের কথা বলা যাবে না, টিভিতে খবরের চ্যানেল বাদে আর কোনো চ্যানেল দেখা যাবে না, সোশ্যাল মিডিয়ায় অপুর্বের নারী বন্ধু রাখা যাবে না ইত্যাদি।

উপরের এই তিনটি ঘটনাই ডাক্তারি পরিভাষায় ওথেলো সিনড্রোমের উদাহরণ। এছাড়াও এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি আরো কিছু অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকেন। যেমন :

  • এরা নিজ সঙ্গীর যে কোনো কাজ সন্দেহের চোখে দেখে।
  • নিয়মিত ফোনের কল লিস্ট চেক করা এদের অন্যতম কাজ গুলোর একটি, কার সাথে কেন কথা হচ্ছে সেই ব্যাপারে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখানো।
  • বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, যেমন- ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম একাউন্টে সঙ্গীর সব কিছু নজরদারিতে রাখা ।
  • প্রতিবেশী কারো সাথে সুসম্পর্ক না রাখা, এমনকি নিজের পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা।

তবে এ কথা অনিশিকার্য যে, কারো মধ্যে উপরের একাধিক ঘটনার মিল থাকে তাহলেই যে সেই ব্যাক্তি ওথেলো সিনড্রোমে ভুগছেন তেমনটা না-ও হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সবার উচিত তাকে অথবা তার পরিবারকে সেই সম্পর্কে জানানো।

 ওথেলো সিনড্রোম

তাসমিম এমা। ছবি – কালাক্ষর ডেয

ওথেলো সিনড্রোম প্রতিরোধ নাকি প্রতিকার

ওথেলো সিনড্রোম প্রতিরোধ করার মত তেমন কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। তবে হ্যা, যদি কোন সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত মজবুত থাকে তবে সাধারণত এই ধরনের সমস্যা হয় না, আর যদি হয়ও তবে তা খুব সহজেই তা কাটিয়ে ওঠা যায়। তবে অনেক সময় স্কিৎজোফ্রেনিয়া, ব্রেইন টিউমার অথবা পারকিনসন্স ডিজিজের রোগীদের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়। আবার অ্যালকোহল বা কোকেনের মতো ড্রাগের সাইড ইফেক্ট হিসেবেও ওথেলো সিনড্রোম মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

ওথেলো সিনড্রোম এর সমস্যাটি যেহেতু মনস্তাত্ত্বিক তাই আগে থেকে বোঝার কিংবা সতর্ক হবার কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। তবে হ্যাঁ, আপনি যেটা করতে পারেন তা হলো, আশেপাশে কারো মধ্যে অথবা আপনার নিজের মধ্যে যদি ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে অহেতুক সন্দেহ, অবিশ্বাস তৈরি হয় তবে সেটা নিজের মধ্যে চেপে রাখবেন না। যেকোনো সমস্যা ঢেকেঢুকে রাখতে গিয়েই কিন্তু আমরা সমস্যাটাকে আরো বড় করে তুলি। তাই এ ব্যাপারে কথা বলুন, বুঝতে চেষ্টা করুন যা আপনি ভাবছেন সেটা কি আদৌ সত্যি? নাকি পুরোটাই আপনার কল্পনা?

পরিবারের সহযোগিতা খুব দরকার

ওথেলো সিনড্রোম মোকাবেলায় সবার আগে যা দরকার তা হলো, ওথেলো সিনড্রোম এ আক্রান্তের পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা। যেকোনো দাম্পত্য কলহে পরিবার একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। আপনার যদি মনে হয় আপনার ভালোবাসার মানুষের জীবনে অন্য কারো অস্তিত্ব আছে, তবে সেটা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করুন। মনগড়া কোনো গল্প বানিয়ে নিজেকে কষ্ট দেবার কোনো মানে হয় না। পরিবারের বাকিদের সাথেও এটা নিয়ে কথা বলুন। নিজের সমস্যার কথা জানান। একে অপরকে জায়গা দিতে গিয়ে আবার দূরে সরে যাবেন না যেন! একে অন্যকে সময় দিন। বাইরের কারো কথায় প্ররোচিত হয়ে আপনজনকে ভুল বুঝলে শেষে ওথেলোর মতো “হায় হায়” করা ছাড়া কিছু করার থাকে না। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সমস্যার সমাধান করুন।

ওথেলো সিনড্রোম

Image Source: politeka.net

নিতে পারেন মনোবিদের পরামর্শ

যে মুহূর্তে আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনার সঙ্গী আপনার প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত, তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় আপনার অনিরাপত্তার ফল, সেই মুহূর্তেই কিন্তু আপনি নিজেই আপনার সমস্যার অর্ধেক সমাধান করে ফেলেছেন। তবে যেহেতু সমস্যাটা মনস্তাত্ত্বিক এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিণতি হয় খুন, জখম, আত্মহত্যা কিংবা সম্পর্কবিচ্ছেদ। তাই আপনার উচিত একজন মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া। আমাদের দেশে সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির জন্য মনোবিদের শরণাপন্ন হওয়াটাকে অনেকেই ভাল চোখে দেখেন না। উল্টো ব্যাপারটা গোপন রাখার দিকেই সবার ঝোঁক। অথচ শুরুর দিকে শুধুমাত্র কাউন্সেলিং করেই সমাধান সম্ভব। তবে সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করলে হালকা কিছু ঔষধপত্র আপনাকে দেয়া হতে পারে।

Loved not wisely, but too well
– Othello

শেষের কথা

ডেসডিমোনা ওথেলোকে ভালোবেসেই ঘর ছেড়েছিল । কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস দেখুন সেই ওথেলোই কিনা সম্পূর্ণ বিনা কারণে ডেসডিমোনাকে হত্যা করল। ওথেলো শুধুমাত্র নিছক সন্দেহের বশে, অন্যের মিথ্যা প্ররোচনায় সায় দিয়ে নিজের সংসার নিজেই ধ্বংস করে ফেলে। অতিরিক্ত যে কোনো কিছুই যে কারো জীবনে ক্ষতি বয়ে আনে তা এখানে স্পস্ট করে দেখা যায়। আর সেটা যদি ভালোবাসার মতো স্বর্গীয় বিষয় হয়,তবে কোন কথাই নেই। সেক্সপিয়ার ওথেলো নাটকে দেখিয়েছেন অতিরিক্ত আসক্তি সব সময়ই ভয়ের কারণ। তাই একজন আরেক জনকে বোঝার জন্য তাকে সময় দিন। আপনাদের সম্পর্কে তিক্ততা যেন কখনও না আসে। প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলার ভয় অস্বাভাবিক না। কিন্তু সেই ভয়ে যদি সম্পর্কই শেষ করে ফেলেন তাহলে কী করে হবে বলুন তো! সর্বদা নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন, নিজের ভালোবাসার মানুষটার উপর বিশ্বাস রাখুন। জেনে রাখুন, আপনার হৃদয়ের অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতিকে উপেক্ষা করার সাধ্য কারো নেই। ধন্যবাদ। সবাই ভাল থাকবেন। 

 

It’s a Bengali article. It discusses Othello’s Syndrome.

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!