Site icon কালাক্ষর

সাইবার যুদ্ধঃ চলুন ভবিষ্যতের যুদ্ধ ক্ষেত্র সমন্ধে জানি

সাইবার যুদ্ধ

সাইবার যুদ্ধ

একদা যুদ্ধ হত রাজায় রাজায়। নির্দিস্ট দিনে নির্দিস্ট স্থানে রাজা গন তাদের রাজ সৈন্য বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করতেন। যে জিতে যেত সে হত ভাগ্য বিধাতা। এই যুদ্ধ গুলোতে জনগণের তেমন একটা অংশ গ্রহন থাকতো না। কিন্তু বিংশ শতাব্দিতে জাতী তত্বের উপর ভিত্তি করে গঠিত হওয়া রাস্ট গুলোতে যুদ্ধ শুরু হয় জাতী তে জাতীতে ফলাফল তখন আর রাজার উপর থাকে না। যুদ্ধের ধ্বংস লীলা জনগন ও খুব ভাল ভাবে টের পাওয়া শুরু করে। বিজিত জাতী গুলোর দ্বারা সৃষ্ট গন হত্যা ই তা প্রমান করে। শত্রু জাতী রাষ্ট গুলোকে নিশ্চিহ্ন করতে পরক্রামশালী রাস্ট গুলো বানব বিদ্ধংশী পারমানবিক বোমা,হাইড্রোজেন বোমা বানাতে শুরু করে।

কিন্তু একাবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই যুদ্ধের মোটিভ পাল্টে গেছে। সামরিক হামলা করে এখন আর কোন রাস্ট অন্য রাস্ট কে ক্ষতি গ্রস্থ করতে চাচ্ছে না, তার চেয়ে অর্থনইতিক ভাবে ক্ষতি গ্রস্থ করার মাধ্যমে যতটা পারা যায় ফলাফল নিজের দিকে আনা যায় এমন ধারণা ফল প্রসু হচ্ছে, আর এর ধারাবাহিকতায় পৃথিবী দেখছে এক নতুন যুদ্ধ। যার নাম সাইবার যুদ্ধ।

সাইবার যুদ্ধ কি?

আধুনিক যুগে কোন কিছুই আর কাগজে লিপি বদ্ধ করে রাখা হয় না। রাস্টের প্রায় সমস্ত ডকুমেন্টস, ব্যাংক, শেয়ারবাজার, সামরিক বেসামরিক প্রায় সমস্ত তথ্য উপাত্ব ইন্টার্নেটে নিজেদের বিভিন্ন সাইটে সংযুক্ত করে রাখা হয়। রাস্টের প্রায় প্রতিটি স্পর্স কাতর ইস্যু অত্যান্ত গোপনীয়তা রক্ষার মাধ্যমে সংরক্ষন করে রাখা হয়। কিন্তু অনেক সময় এক দেশের হ্যাকার রা অন্য দেশের এই সকল তথ্য উপাত্য সমুহ সমৃদ্ধ ওয়েব সাইট গুলো হ্যাক করার মাধ্যমে সেই সকল সাইটে রাখা সকল স্পর্স কাতর ডাটা চুরি করে নিয়ে যায়। বা সেই সকল সাইটের ডাটা নষ্ট করে দেওয়ার ফলে অপরনীয় ক্ষতি সাধন করতে পারে। এক দেশের সাইবার জগতে অন্য দেশের হ্যাকারদের আক্রমন কে সাইবার আক্রমন বলে তেমনি এক দেশের হ্যাকারদের সাথে অন্য দেশের হ্যাকার দের ওয়েব সাইট হ্যাক করার যে যুদ্ধ চলে তাকেই সাইবার যুদ্ধ বলে।

সৃজন শীল বাংলা ব্লগ কালাক্ষর এ আমার আগের লেখা গুলো পড়তে নিচের লিংক গুলোতে ক্লিক করুন 

যাই হোক,সারা বিশ্ব এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত থাকার কারণে তথ্য চুরি করার মাধ্যমে কোন রাস্ট্রের স্পর্সকাতর তথ্য জেনে নেওয়া,ব্যবসায়িক ক্ষতি করা, নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো, ইত্যাদি কর্মকান্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর সাথে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন প্রক্রিয়া যুক্ত হওয়াতেই ‘সাইবার যুদ্ধ’ শব্দগুচ্ছের অবতারণা করা হচ্ছে, তা সে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হোক, বা মহানবী (সাঃ)এর অপমানের প্রতিশোধই হোক। ‘যুদ্ধ’ না করেও এই ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা এমন এক যুদ্ধাবস্থার জন্ম দিচ্ছে যে, তা প্রথাগত ‘যুদ্ধ’এর সংজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।

নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরিকসেন সোরেইডে গত ১৩ই অক্টোবর ঘোষণা দেন যে অগাস্ট মাসে নরওয়ের পার্লামেন্টে সাইবার হামলার পিছনে দায়ী রাশিয়া ছিল। যদিও তিনি কোন প্রমাণ দেখাতে পারেন নি,তার পরেও তিনি বলেন যে, নরওয়ের সরকারী গোয়েন্দাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই হামলার পিছনে রাশিয়া ই রয়েছে । নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই দাবী মস্কো তাৎক্ষনিক অস্বীকার করে এবং ক্রেমেলিন এর তরফ থেকে বলা হয় নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শিষ্টাচার বিরধী এবং এটি একটা মারাত্মক এবং ইচ্ছাকৃত উস্কানি মুলক বক্তব্য।

নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আমলে নিয়ে অসলোতে রুশ দূতাবাস থেকে বলা হয়, প্রতিবছর রাশিয়ান সাইবার সংস্থার বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ হামলা হয়; কিন্তু তা সত্তেও রাশিয়া কখনোই হামলার উৎস যেই দেশ সমূহের নেতৃত্বকে কোন বাছবিচার ছাড়াই অভিযুক্ত করে না। সেপ্টেম্বরে নরওয়ের সরকার বলে যে, কয়েকজন কর্মকর্তার ইমেইল একাউন্ট হ্যাকিং হয়েছে এবং কিছু তথ্য ডাউনলোড করা হয়েছে। তবে সমস্যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা তারা জনসম্মুখে আনেননি। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, নরওয়ের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে ভালো যাচ্ছে না। গত অগাস্টে নরওয়ে রুশ এক কূটনীতিবিদকে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে বহিষ্কার করে। রাশিয়াও এর প্রতিবাদে নরওয়ের এক কূটনীতিককে বহিষ্কার করে।

নরওয়ে সরকার এক রুশ নাগরিককে ২০১৮ সালে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে । পরে অবশ্য উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০২০ সালের শুরুতে নরওয়ের সামরিক ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে দাবী করা হয় যে, রাশিয়া নরওয়েতে তার প্রভাব বিস্তারের জন্য অপারেশন চালাচ্ছে; এই জন্য তারা নরওয়ের সরকার, নির্বাচন পদ্ধতি এবং মিডিয়ার উপর জনগণের আস্থা কমিয়ে ফেলার জন্য যথা সাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমন দাবী অবশ্য শুধু মাত্র নরওয়েই নয়, অন্যান্য দেশও সাইবার হামলার জন্যে অন্য রাষ্ট্রকে, বিশেষ করে চীন এবং রাশিয়াকে অভিযুক্ত করছে।

গত ২০২১ এর জানুয়ারি মাসে জার্মানিতে চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল সহ কয়েক’শ রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে অনলাইনে প্রকাশ করে দেয়া হয়। আর গত বছর অস্ট্রেলিয়ার সাইবার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি অভিযোগ করে যে, চীন অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে হ্যাকিং করে ঢোকার চেষ্টা করেছে। চীন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। ঘটনাগুলি বর্তমান বিশ্বে চলা এই ‘সাইবার যুদ্ধ’কেই হাইলাইট করছে। এর বর্তমানে এবং ভবিষ্যৎ এখন আলোচনার বিষয়বস্তু।

গত ১৯শে অক্টোবর মার্কিন এবং ব্রিটিশ সরকার একটা রুশ হ্যাকিং দলের বিরুদ্ধে লম্বা অভিযোগ দায়ের করে। ‘স্যান্ডওয়ার্ম’ নামে পরিচিত ছয় সদস্যের এই হ্যাকিং গ্রুপের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়, তা মাঝে রয়েছে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা, ২০১৭ সালে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর নির্বাচনে জেতার সময় অনলাইনে প্রভাব বিস্তার, ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অলিম্পিকের সময় সাইবার হামলা, এবং ২০১৮ সালে ব্রিটেনের সলসবুরিতে নার্ভ গ্যাস আক্রমণের সময় তদন্তের উপর নজরদারি।
এছাড়াও ২০১৬ সালে ‘ফ্যান্সি বেয়ার’ নামে একই গ্রুপ মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের আগে হিলারি ক্লিন্টন এবং ডেমোক্র্যাটিক জাতীয় কমিটির ইমেইল হ্যাকিং করেছিল বলে বলা হয়। অভিযোগে রুশ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ‘জিআরইউ’এর অংশ এই গ্রুপের অফিস মস্কোর বাইরে খিমিকিতে ২২ কিরোভা স্ট্রীটের এক নীল রঙের কাঁচের সুউচ্চ ভবনে রয়েছে বলে বলা হয়।

“দ্যা টাওয়ার” নামে পরিচিত সেই ভবনে কাজ করা এই গ্রুপ ‘ইউনিট ৭৪৪৫৫’ নামে পরিচিত। লম্বা সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ এবং গুগল, ফেইসবুক, সিসকো এবং টুইটারের সাথে যৌথভাবে তদন্ত করে মার্কিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই অভিযোগ পেশ করে। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রফেসর থমাস রিড বলেন যে, অভিযোগপত্রের বিষদ বিবরণ দেখে মনে হচ্ছে যে, ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ রুশ ইন্টেলিজেন্সের ভেতরকার বহু ব্যাপার সম্পর্কে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল; বিশেষ করে যেসকল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেই তথ্যগুলি এখন আর গোপনীয় মনে করা হচ্ছে না বলেই প্রকাশ করা হয়েছে।

নিজেদের কর্মকান্ড গোপন রাখার জন্যে ‘ইউনিট ৭৪৪৫৫’ হয়তো অনেক চেষ্টাই করেছে; তথাপি কিছু ক্ষেত্রে তারা যথেষ্টই অদূরদর্শিতা দেখিয়েছে। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স ‘বেলিংক্যাট’এর আরিক টোলার বলছেন যে, ছয়জনের মাঝে তিনজনই তাদের গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন একই ঠিকানা থেকে। এই ঠিকানাই সেই ইউনিটকে নির্দেশ করে। এই একই ঠিকানায় মোট ৪৭ জন লোক তাদের গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে। হয়তো এরা সকলেই ‘জিআরইউ’এর হ্যাকার দলের সদস্য।

১৯শে অক্টোবর মার্কিন এবং ব্রিটিশ সরকার একটা রুশ হ্যাকিং দলের বিরুদ্ধে লম্বা অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগপত্রের বিষদ বিবরণ দেখে মনে হচ্ছে যে, ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ রুশ ইন্টেলিজেন্সের ভেতরকার বহু ব্যাপার সম্পর্কে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল; বিশেষ করে যেসকল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেই তথ্যগুলি এখন আর গোপনীয় মনে করা হচ্ছে না বলেই প্রকাশ করা হয়েছে।

পশ্চিমা নেতৃবৃন্দ ইতোমধ্যেই এই সাইবার হামলাকে ‘সাইবার যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন এবং সেই লক্ষ্যে নিজেদের প্রস্তুতি বৃদ্ধি করার কথা বলছেন। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তা জেনারেল নিক কার্টার ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’এর এক আলোচনায় দাবি করেন যে, রাশিয়া এবং চীন সাইবার আক্রমণ, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং ব্যাপক গোয়েন্দাবৃত্তির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলির উপর “রাজনৈতিক যুদ্ধ” চালাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো, অফিশিয়ালি কোন সংঘাতে না জড়িয়েই পশ্চিমা দেশগুলির ইচ্ছাশক্তিকে ভেঙ্গে ফেলা।

তিনি আরও বলেন যে, ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি যুদ্ধে যাবার জন্যে প্রস্তুত নয়; তথাপি তারা সামরিক সংঘাতের সংজ্ঞার ঠিক বাইরে থেকে অপারেশন চালিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০১৭ সালে ইউক্রেনের ব্যাংক এবং জ্বালানি কোম্পানির উপর রুশ হামলার অভিযোগকে টেনে আনেন। একইসাথে তিনি স্যাটেলাইট সিস্টেমকে সমস্যা ফেলার জন্যে বেইজিংএর প্রকল্পগুলির উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাদের শত্রুদের যুদ্ধ ছাড়া জয়লাভের এই কৌশলকে হারানো খুবই কঠিন; কারণ তা পশ্চিমা চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’কে খর্ব না করে মোকাবিলা করা যাবে না। জেনারেল কার্টার রাশিয়া এবং চীনকে এক কাতারে ফেললেও কেউ কেউ এই দুই দেশের কর্মকান্ডকে আলাদা করে দেখছেন। ‘

নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর প্রবীন সাংবাদিক ডেভিড স্যাঙ্গার মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সাথে এক সাক্ষাতে রাশিয়া এবং চীনের সাইবার কর্মকান্ডের মাঝে পার্থক্য করতে গিয়ে বলেন যে, রুশরা হলো ‘টর্নেডোর মতো’, আর চীনারা হলো ‘জলবায়ু পরিবর্তন’এর মতো। তিনি আরও বলেন যে, চীনারা বিশ্বব্যাপী নিজেদের একটা ভালো প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে চায়; যেকারণে তারা সাইবার যুদ্ধের মাঝে শুধু গোয়েন্দাবৃত্তিকেই প্রধান্য দিচ্ছে। তারা এই যুদ্ধের ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করতে চায় না। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানিয়েল ওয়াগনার ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীন ইতোমধ্যেই সাইবার যুদ্ধের দিক দিয়ে পশ্চিমাদের চাইতে অনেক এগিয়ে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের করার মতো তেমন কিছুই নেই। তারা সর্বোচ্চ চীনাদের মতো করেই নিজেদের কর্মপদ্ধতিকে গোছাতে পারে যাতে চীনের সমকক্ষ হওয়া যায়। এর অর্থ হলো খবরের পিছনে গোপনে সাইবার যুদ্ধ চালিয়ে নেয়া, যা ইতোমধ্যেই ভবিষ্যতের যুদ্ধকে সংজ্ঞায়িত করছে।

সাইবার যুদ্ধের পরিধি অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গা এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই অভিযোগ করেছে যে, রাশিয়া এবং চীন পশ্চিমা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং মেডিক্যাল গবেষণা সংস্থার ভেতর হ্যাকিং করে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছে। ভারতীয় থিংকট্যাঙ্ক ‘অবজার্ভার রিচার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তাকে ভারতের পারমাণবিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তার একটা প্রধান স্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়। পারমাণবিক স্থাপনার অন্যান্য নিরাপত্তার সাথে সাথে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মাথায় রেখেই সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়।

সাইবার হামলাকে একটা প্রতিবাদ বা প্রতিআক্রমণের পদ্ধতি হিসেবেও দেখা শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগেই ফ্রান্সে রাসূল (সাঃ)কে বিদ্রুপ করা নিয়ে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর বক্তব্যের পর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ফ্রান্সের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা শুরু হয়। কোন রাষ্ট্র এই হ্যাকিংএ সরাসরি সমর্থন না দিলেও তা মুসলিম বিশ্বের আবেগের একটা বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

পুঁজিবাদী বিশ্বে অর্থসম্পদের গুরুত্ব যেহেতু সর্বোচ্চ, তাই অর্থসম্পদ আহরণ এবং তার দখল নিয়ে প্রতিযোগিতাই হয়ে গিয়েছে দুনিয়ার মানুষের মূল কর্মকান্ড। এই প্রতিযোগিতায় অপরের আর্থিক ক্ষতি করা এবং একইভাবে বিপক্ষের হামলা থেকে নিজের অর্থসম্পদ রক্ষা করাও হয়ে গিয়েছে একটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য অর্জনে সাইবার যুদ্ধ সবচাইতে কম খরচের যুদ্ধ; কারণ এতে কোন বিশাল সৈন্যবাহিনী পুষতে হয়না; আর নিজের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও কম থাকে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বৈশ্বিক মন্দার মাঝে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সামরিক হামলার চাইতে কম নয়।

তবে অর্থসম্পদ বাঁচাতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পশ্চিমারা তাদের আদর্শের পবিত্র স্তম্ভ ‘স্বাধীনতা’কেই বিসর্জন দিচ্ছে। ‘স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করতে গিয়ে স্বাধীনতা খর্বের পরিকল্পনাগুলি পশ্চিমা আদর্শের ভিতে আঘাত করছে। আর অপরদিকে সারা বিশ্ব এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত থাকার কারণে তথ্য চুরি করা, ব্যবসায়িক ক্ষতি করা, জননিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানো,নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ইত্যাদি কর্মকান্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর সাথে রাজনৈতিক লক্ষ্য যুক্ত হওয়াতেই ‘সাইবার যুদ্ধ’ শব্দগুচ্ছের অবতারণা, তা সে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হোক, বা মহানবী (সাঃ)এর অপমানের প্রতিশোধই হোক। ‘যুদ্ধ’ না করেও এই ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা এমন এক যুদ্ধাবস্থার জন্ম দিচ্ছে যে, তা ‘যুদ্ধ’এর সংজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।

Exit mobile version