Site icon কালাক্ষর

লিও টলস্টয়: সৈনিক থেকে বিশ্বসেরা সাহিত্যিক

লিও টলস্টয়: সৈনিক থেকে বিশ্বসেরা সাহিত্যিক

লিও টলস্টয়। ইমেজ সোর্স - biography.com

পৃথিবীর প্রত্যেকেই গোটা পৃথিবীটাকে বদলে ফেলার চিন্তা করে, কিন্তু কেউ নিজেকে পরিবর্তনের কথা ভাবে না। 

কথাটি বলেছিলেন  সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে যাকে ধরা হয় সেই কাউন্ট লিও টলস্টয়। লিও টলস্টয় অন্যকে নয় বরং সবার আগে নিজেকে পরিবর্তনের কথা বলতেন। আর সে কারণে তিনি সবার আগে নিজেকে পরিবর্তন করেছিলেন এবং সেই সাথে অসংখ্য মানুষকেও পরিবর্তন করেছিলেন।  লিও টলস্টয় মানুষকে জীবনের উদ্দেশ্য বোঝাতে চাইতেন যাতে মানুষের মধ্যে জীবনবোধ, মনুষ্যত্ববোধ, নীতিবোধ জাগ্রত হয়।

উনিশ শতকের ব্রিটিশ কবি ও সমালোচক মেথু আর্নল্ড লিও টলস্টয় সম্পর্কে বলেছিলেন যে, টলস্টয় শুধু এক শিল্পকর্ম নয়, বরং জীবনের একটা অংশ।“লিও টলস্টয় সম্পর্কে মেথু আর্নল্ড কথাটি যথার্থী ছিল। কারন টলস্টয়ের লেখাগুলোতে জীবন ও নীতিবোধ এর যে মেলাবন্ধন ফুটে ওঠে তা তাঁর অন্য কারো লেখার ভিতর খুব একটা ফুটে উঠতে দেখা যায় না। লিও টলস্টয় তথকথিত কবি সাহিত্যিকের ন্যায়  ‘শিল্পের জন্য শিল্প’- এ মতবাদ বিশ্বাস করতেন না। লিও টলস্টয় মনে করতেন সাহিত্য হবে জীবনের জন্য, যে খানে মানবতা নৈতিকতার এক যোগ সুত্র স্থাপন হয়। মানুষের চিরায়ত কামনা ও শান্তির অন্বেষা টলস্টয়ের সাহিত্যকে অমর করে রেখেছে । 

টলস্টয় সম্পর্কে বিখ্যাত রাশিয়ান লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছিলেন, টলস্টয় তো নিজেই একটি পৃথিবী” জীবন ঘনিষ্ট লেখা সমৃদ্ধ সাহিত্যগুলো টলস্টয়কে শুধুমাত্র রুশ সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম সেরা লেখকই নয়, বরং বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক ও সাহিত্যক হিসেবে ঠাই দিয়েছে। সাহিত্যমান ও লেখার বিচারে তার সমকক্ষ সাহিত্যিক বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে খুব কম খুব ী জন্মেছে  । 

১৮২৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর (২৮ আগস্ট, পুরাতন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী); রাশিয়ান সাম্রাজ্যের টুলা প্রদেশের ইয়াস্নায়া পলিয়ানার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিশ্বসাহিত্যের বিস্ময় এই ক্ষণজন্মা মানুষটির জন্ম গ্রহন করেন। রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে ১৩০ মাইল দক্ষিণে ইয়াস্নায়া পলিয়ানা অবস্থিত,ইয়াস্নায়া পলিয়ানাতেই মহান সাহিত্যিক টলস্টয় তার জীবনের সেরা সময়গুলো কাটিয়েছেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন । 

টলস্টয়ের পুরো নাম কাউন্ট লেভ (লিও) নিকোলায়েভিচ টলস্টয়। টলস্টয়ের বাবা ও মা উভয় দিক থেকেই তিনি ছিলেন রাশিয়ান খাঁটি অভিজাত পরিবারের বংশধর। টলস্টয়ের বাবা কাউন্ট নিকোলাই ইলিচ টলস্টয়ের বিশাল জমিদারি ছিল। চার ভাই বোনের ভিতর টলস্টয় ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। দুর্ভাগ্যবশত টলস্টয়ের বয়স যখন দুই তখন টলস্টয়ের মা মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যুর পর টলস্টয় কে দেখাশোনার ভার দেওয়া হয় তার ফুফু আলেকজান্দার হাতে। 

হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে আমার অন্য লেখা গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংক গুলোতে ক্লিক করুনঃ

স্বজন হারানোর মধ্য দিয়ে টলস্টয়ের প্রথম জীবনটা শুধু গিয়েছে। এ সময়ে তাকে একের পর এক স্বজন হারাবার বেদনা সয্য করতে হয়। ১৮৩০ সালে মায়ের মৃত্যুর কয়েক বছর পর তাঁর বাবা ১৮৩৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বাবার মৃত্যুর এক বছর পর তার দাদী দেহত্যাগ করেন এবং ১৮৪১ সালে মায়ের মৃত্যু পর যে ফুফুর কাছে লালন পালন হচ্ছিলেন সেই ফুফু আলেকজান্দ্রাও মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তিনি তাঁর আরেক ফুফুর অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন, টলস্টয়ের এই ফুফু থাকতেন রাশিয়ার কাজান শহরে। তিনি এ সময় টলস্টয়কে নিজের সাথে কাজানে নিয়ে যান। 

কাজানে ফরাসি ও জার্মান গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে ফুফুর বাড়িতেই টলস্টয়কে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এর পর টলস্টয় কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে অরিয়েন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে ভর্তি হন, কিন্তু টলস্টয় প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখায় বরাবরই অমনোযোগী ছিলেন। ফলে বছর শেষে যা হবার চুরান্ত পরিক্ষায়  খারাপ করেছিলেন। পড়া লেখায় খারাপ তাই তাঁর ফুফু তাকে তুলনামূলক সহজ, আইন অনুষদে স্থানান্তরিত করেন। কিন্তু দেখা গেল সেখানেও টলস্টয়ের একই অবস্থা, সেখানেও খারাপ রেজাল্ট করেন। 

টলস্টয় আইন অনুষদে পড়ার সময় তিনি ফরাসি রাজনৈতিক দার্শনিক মন্টেস্কুর দ্য ‘স্পিরিট অভ লজ’ এবং ক্যাথরিন দ্য গ্রেটের ‘নাকাজ’ (আইনের কোডের নির্দেশাবলি) এর উপর একটি তুলনামূলক লেখা লিখেছিলেন। লেখার মান খুব সহজ ছিল কিন্তু এ সময়টিতেই টলস্টয়কে সাহিত্য ও নীতিশাস্ত্রের উপর খুব বেশি আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখা যায়। এই সময় টলস্টয় ইংরেজ সাহিত্যিক লরেন্স স্টার্ন এবং চার্লস ডিকেন্স এবং  ফরাসি দার্শনিক জাঁ জ্যাক রুশোর সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন। টলস্টয় প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখায় প্রতি খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না বলে কোনো ডিগ্রি ছাড়াই ১৮৪৭ সালে কাজান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখার পাঠ চুকান ।

টলস্টয় কাজান বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর তাঁর জন্মস্থান ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় ফিরে আসেন। সেখানে তার বাবার যে বিশাল জমিদারি ছিল সেখানকার গ্রামের কৃষকদের সাথে কৃষিকাজ করার মনস্থির করেন। কিন্তু টলস্টয় কৃষি কাজেও ভালো করতে পারেননি। এমতাবস্থায় টলস্টয়ের সেনা কর্মকর্তা বড় ভাই নিকোলাই কোনো এক ছুটিতে বাড়িতে আসেন আর তাকে দেখে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে দেওয়ার কথা ভাবেন। একথা টলস্টয়কে বলার পর তিনিও রাজি হয়ে যান এবং ভাইয়ের সাথে ককেশাসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ককেশাসে তিনি কয়েক বছর সৈনিক হিসেবে কাটান। টলস্টয় তাঁর ককেশাসে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে পরবর্তীকালে লেখেন তার জীবনের অন্যতম সাহিত্যকর্ম ‘ককেশাসের বন্দী ও কসাক’। 

একদিকে চলছে সৈনিক জীবন, সেই সঙ্গে সাহিত্যকর্মও চালিয়ে যেতে থাকলেন টলস্টয়। ককেসাসে থাকা অবস্থায় তিনি নিজের আত্মজীবনীমূলক ট্রিলজি উপন্যাসের কাজ শুরু করেন। কয়েকমাস পর শেষ করলেন আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের প্রথম পর্ব ‘শৈশব’। সেখানে তিনি মূলত তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন। স্থানীয় একটি পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলেন লেখাটি। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন নেক্রাসভ নামের এক ভদ্রলোক। কয়েকমাস পর ‘শৈশব’ পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন বলে টলস্টয়কে চিঠি লিখে উতসাহ দেন। সম্পাদকের প্রশংসায় উৎসাহিত হয়ে টলস্টয় লেখা শুরু করেন উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব ‘কৈশোর’। 

লিও টলস্টয়। ইমেজ সোর্স – biography.com

এর ভিতর রাশিয়ার সাথে অটোম্যান তুর্কিদের সাথে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়। ফলে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ১৮৫৪ সালের নভেম্বরে টলস্টয় ককেশাস থেকে ক্রিমিয়ার সেভাস্তপোলে যুদ্ধের জন্য যান। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে টলস্টয় বিহ্বল হয়ে পড়েন। যুদ্ধের সহিংসতা দেখে যত দ্রুত সম্ভব টলস্টয় যুদ্ধ শেষ না হতেই সেনাবাহিনী থেকে ইস্তফা দেন। 

টলস্টয় সেনাবাহিনী ছাড়ার পর সেন্ট পিটার্সবার্গে যান। সেখানে কিছুদিন থেকে কয়েকটি সাহিত্যকর্ম রচনা করেন। এরপর সেখান থেকে আবার নিজের জমিদারি ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় ফিরে এসে লেখা শুরু করেন আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের তৃতীয় পর্ব ‘যৌবন’। টলস্টয় তার এই আত্মজীবনীমূলক ট্রিলজি (শৈশব, কৈশোর ও যৌবন) উপন্যাসটি টলস্টয়ের জীবনের এক জীবন্ত চিত্র। এই খানে টলস্টয় তার যাবিত শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের স্মৃতিচারণ করেছেন।  

টলস্টয় ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় কিছুদিন জমিদারি দেখাশোনা করার পর  টলস্টয় স্থির করলেন তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করবেন। ইউরোপ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে  টলস্টয়  প্রথমেই গেলেন তৎকালীন ইউরোপের সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল প্যারিসে।  টলস্টয় প্যারিস ভ্রমণ শেষে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যান। জেনেভায় কয়েকদিন থাকার পর টলস্টয় রাশিয়ার মস্কোতে চলে আসেন। এর কিছুদিন পর টলস্টয় এক ডাক্তারের মেয়ে সোফিয়াকে বিয়ে করেন। এর পর টলস্টয় সোফিয়াকে নিয়ে ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় নিজের জমিদারিতে ফিরে এসে সেখানেই বাস করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে এই দম্পতি ১৩ সন্তানের জন্ম দেন । 

টলস্টয় ভ্রমণ ও বিবাহ শেষে এবার আবারও সাহিত্য সাধনায় মনোযোগ দেন। ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাসিকা ‘কসাক’।  টলস্টয় এর লেখা কসাক রাশিয়ায় তুমুল জনপ্রিয় হয় এবং টলস্টয় জনপ্রিয় সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

টলস্টয় এরপর শুরু করলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ার এন্ড পিস’। ওয়ার এন্ড পিস উপন্যাসটি ১৮৬৫ থেকে ১৮৬৭ সালে পর্যন্ত সিরিয়াল আকারে ‘দ্য রাশিয়ান মেসেঞ্জার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হত। এরপর ১৮৬৯ সালে দীর্ঘ পাঁচ বছরের কঠোর সাধনার ফলশ্রুতিতে একত্রে বই আকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের সাথে সাথেই এটি পাঠক ও সমালোচকদের প্রশংসা পেতে থাকে। এই উপন্যাসের মাধ্যমে টলস্টয় খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেন। উপন্যাসটি ১৮০৫ থেকে ১৮১৩ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার সমাজের বিভিন্ন পটভূমিতে লেখা। বারো শতাধিক পৃষ্ঠা এবং ছয় শতাধিক চরিত্র নিয়ে বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে অমর এক সাহিত্যকর্ম হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে এটি। এই উপন্যাসের প্রভাব এতটাই বেশি যে এটি অবলম্বনে অনেকগুলো সিনেমা ও টিভি সিরিজ তৈরি হয়েছে। 

উনিশ শতকের শুরুতে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের রাশিয়া আক্রমণ ও এর পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচটি অভিজাত রাশিয়ান পরিবারের মধ্যে ভাঙা-গড়ার যে খেলা তারই কাহিনী এই উপন্যাস। ইতিহাসের সাথে কল্পনার সংযোগে এক কালজয়ী সাহিত্যে পরিণত হয় ওয়ার এন্ড পিস। 

ওয়ার এন্ড পিসের সাফল্যের পর ১৮৭৩ সালে টলস্টয় তার দ্বিতীয় সেরা উপন্যাস ‘আন্না কারেনিনা’ লেখা শুরু করেন। এটি ১৮৭৩ থেকে ১৮৭৭ সালে পর্যন্ত ‘দ্য রাশিয়ান মেসেঞ্জার’ পত্রিকায় সিরিজ আকারে প্রকাশিত হয়। এরপর ১৮৭৮ সালে প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয়। ধারণা করা হয়, ‘আন্না কারেনিনা’য় টলস্টয় নিজের জীবন থেকে নেওয়া কিছু গল্পকে কাল্পনিক রূপ দেন। বইয়ের প্রথম বাক্যটি এর সেরা বাক্যগুলোর মধ্যে একটি।  

সমস্ত সুখী পরিবার একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ,  প্রতিটি অসুখী পরিবার তার নিজের নিজের উপায়ে অসন্তুষ্ট।


টলস্টয়ের ‘আন্না কারেনিনা’ থেকে ২০১২ সালে ‘আন্না কারেনিনা’ নামে সিনেমা তৈরি হয়; image source: themoviedb.org

আন্না কারেনিনার প্রকাশের পর এর সফলতা সত্ত্বেও টলস্টয় কয়েকটি কারণে হতাশায় ভুগছিলেন। এই সময় তিনি আধ্যাত্মিক সংকটের মুখোমুখি হন। জীবনের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য উন্মোচনের জন্য তিনি উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। জীবনের উদ্দেশ্য ও অর্থ সম্পর্কে ধর্ম কী বলে তা জানার জন্য তিনি প্রথমে রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চে যান, কিন্তু সেখানে তিনি যে উত্তর চেয়েছিলেন তা খুঁজে পাননি। এরপর তিনি নিয়মিত চার্চে যেতেন, নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতেন। একসময় তার মনে হতে থাকে খ্রিস্টান গির্জাগুলো দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছে এবং মূল ধর্ম থেকে সরে এসেছে। গির্জাগুলো মূল ধর্মের পরিবর্তে তাদের মনগড়া নিজস্ব বিশ্বাস তৈরি করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

তিনি তার এই মতবাদ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৮৮৩ সালে ‘দ্য মিডিয়েটর’ নামে একটি নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠা করেন। এতে তিনি চার্চ ও খ্রিস্টান ধর্মজগতের মানুষদের সমালোচনা করে বেশ কয়েকটি রচনা প্রকাশ করেন। এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে । 

একসময় তিনি ধনসম্পদ সঞ্চয় করাকে পাপ মনে করতে থাকেন এবং নিজেকে ধনসম্পদ সঞ্চয়ের পাপে পাপী মনে করতে থাকেন। তিনি তার সমস্ত ধনসম্পদ সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেন। এবার তীব্র আপত্তি আসে স্ত্রী সোফিয়ার কাছ থেকে। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে টলস্টয়ের আদর্শকে মানতে নারাজ সোফিয়া। সাংসারিক বিবাদ ক্রমেই চরমে উঠতে থাকে। এমতাবস্থায় টলস্টয় ১৮৮১ সালের পূর্বে লেখা সমস্ত লেখার স্বত্ব স্ত্রী সোফিয়াকে উইল করে দেন।

এ সময় টলস্টয় ধর্ম ও নৈতিকতার জগতে প্রবেশ করেন। তার পরবর্তী রচনাগুলোতে স্পষ্টতই নৈতিকতা ফুটে ওঠে। পরবর্তীতে তিনি নৈতিক গল্প ও বাস্তববাদী সাহিত্য রচনা করতে থাকেন। তার সবচেয়ে সফল পরবর্তী রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৮৮৬ সালে রচিত ‘দ্য ডেথ অফ ইভান ইলিচ’।

এরপর লেখেন তার আরেক বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘রেজারেকশান’। ‘রেজারেকশান’ তার আগের উপন্যাসগুলোর যোগ্য উত্তরসূরি ছিল। বেশ প্রশংসা পায় উপন্যাসটি। ইতিমধ্যে তার আরো কিছু রচনা প্রকাশিত হলো। এ সময় তিনি ‘মানুষের কতটুকু জমি প্রয়োজন’, ‘যেখানে ভালোবাসা সেখানেই ঈশ্বর’, ‘মানুষ কী নিয়ে বাঁচে’ এমন কিছু বিশ্ববিখ্যাত গল্প রচনা করেন। পরবর্তীতে লেখেন তার আরেক বিখ্যাত বড় গল্প ‘হাজী মুরাদ’। 

জীবনের শেষ তিন দশক তিনি ধর্ম ও নৈতিকতার মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তার অশুভ বিরোধী অহিংস মতবাদ ভারতের জাতীয় নেতা মহাত্মা গান্ধীকে প্রভাবিত করে। মহাত্মা গান্ধী টলস্টয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী অহিংস আন্দোলন গড়ে তোলেন।

তার আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সাথে গৃহজীবনের উত্তেজনা ক্রমশই চরমে উঠতে থাকে। তার স্ত্রী শুধু তার বিশ্বাস আর শিক্ষাকেই অস্বীকার করেননি, বরং তার ভক্তদের, যারা নিয়মিত টলস্টয়ের সাথে দেখা করতো, তাদের সাথেও দুর্ব্যবহার শুরু করেন। তখন ১৯১০ সাল, স্ত্রী সোফিয়ার সাথে ক্রমবর্ধমান বিবাদ থেকে বাঁচতে তার কন্যা আলেকজান্দ্রা ও একজন চিকিৎসককে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান অজানার উদ্দেশ্যে। কিন্তু একজন বিরাশি বছরের বৃদ্ধের কাছে এই যাত্রা খুব কষ্টকর ছিল। ১৯১০ সালের নভেম্বরে রাশিয়ার আস্তাপোভের একটি ট্রেন স্টেশনে নেমে পড়েন তারা। তখন শারীরিকভাবে একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েছেন টলস্টয়। স্টেশন সংলগ্ন একটি বাড়িতে তাকে আশ্রয় দেয়া হয়। সেই বাড়িতে ১৯১০ সালের ২০ নভেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরপর তাকে তার চিরচেনা ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় কবর দেয়া হয় । 

টলস্টয়ের মৃত্যুর মাধ্যমে বিশ্ব এক চলমান আদর্শকে হারিয়েছে। হারিয়েছে বিশ্বসাহিত্যের এক কিংবদন্তিকে। তিনি মৃত্যুবরণ করলেও তার আদর্শ সমুন্নত রয়েছে। তিনি যে নৈতিক শিক্ষা দিয়ে গেছেন তা অসংখ্য মানুষকে প্রভাবিত করেছে। তার আদর্শ মহাত্মা গান্ধীর মতো অনেক নেতাকে প্রভাবিত করেছে। ধারণা করা হয়, রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ও রুশ বিপ্লব অনেকাংশে টলস্টয়ের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত।

তিনি ১৯০২ থেকে ১৯০৬ সালে পর্যন্ত প্রতি বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন এবং ১৯০১, ১৯০২ ও ১৯১০ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। কিন্তু এই মহান মানুষটি কখনো নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হননি, যা নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। আজ পর্যন্ত টলস্টয়ের উপন্যাসগুলো বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।

Reference:

  1. Leo Tolstoy Biography (1828–1910)
  2. Biography of Leo Tolstoy, Influential Russian Writer
  3. Leo Tolstoy Russian writer
  4. Leo Tolstoy
  5. Leo Tolstoy Biography

Exit mobile version