Site icon কালাক্ষর

ফ্লাইং ডাচম্যান : যে জাহাজ কোনদিন নোঙ্গর ফেলেনি

ফ্লাইং ডাচম্যান

ফ্লাইং ডাচম্যান

ভয় কে জয় করতে না পারলে সেখান থেকে জন্ম হয় কু সংস্কারের। আবার অন্য অর্থে বলা যায়। সদা উত্তর খুজতে ব্যাস্ত মানব মন যখন কোন বিষয়ে সুস্পস্ট সমাধানের বা রহস্যের উত্তর খুঁজে পায় না তখন সেই খানে জন্ম ন্যায় কু সংস্কারের। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বস্তু ফ্ল্যাইং ডাচম্যান (The Flying Dutchman) ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযজ্য। কারণ এটি এমন এক ভুতুড়ে জাহাজ, যা আজ অব্ধি কোনো বন্দরে নোঙ্গর ফেলেনি ! আর এই জাহাজটি কেন ই বা নোঙ্গর ফেলেনি। আবার আদতে এটি কি? তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের যেমন কমতি নেই। তেমনি এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও কেউ দিতে পারে নি। সমুদ্রের অভিশাপ হিসেবে পরিচিত পাওয়া এই জাহাজটিকে ঘিরে তাই কুসংস্কারের ও কমতি নেই। বলা হয়ে থাকে ১৭ শতক থেকে এই জাহাজের কথা মানুষের মাঝে প্রচলিত হয়ে আসছে। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রচণ্ড দাপট যখন জুড়ে সারা বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেই সময়টাতেই এই ভুতুড়ে জাহাজের আবির্ভাব ঘটেছিল।  

এই জাহাজ সম্পর্কিত প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী জানা যায়, এই ভুতুড়ে জাহাজ মাঝ সমুদ্রে অন্য একটি বন্দরগামী জাহাজকে হুট করেই দর্শন দিয়ে এক ধরণের ভুতুড়ে আলো দেখায়। এই আলো দেখানোর মানে হল ফ্লাইং ডাচম্যান বন্দরে থাকা মানুষদের একটি বার্তা দিতে চাওয়ার প্রয়াস মাত্র। আর সেই বার্তা হল ‘দুর্ভাগ্য’ বা তাদের ‘মৃত্যু অতি সন্নিকটে’ !   

ফ্লাইং ডাচম্যান নিয়ে প্রতিটি বন্দরের নাবিকদের মাঝে অনেক লোককথা প্রচলিত আছে, সেই উপকথার  মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখ্য ২টি উপকথা হল –

ফ্লাইং ডাচম্যান জাহাজটি নিয়ে John MacDonald ১৭৯০ সালে প্রথম মুদ্রিত লেখা লিখেন। তিনি তাঁর বর্ননাতে বলেনঃ

“The weather was so stormy that the sailors said they saw the Flying Dutchman. The common story is that this Dutchman came to the Cape in distress of weather and wanted to get into harbour but could not get a pilot to conduct her and was lost and that ever since in very bad weather her vision appears”

মহা বিতর্কিত এই ফ্লাইং ডাচম্যান জাহাজ নিয়ে পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় Chapter VI of A Voyage to Botany Bay (1795), সেখানে এই ভুতুড়ে জাহ‍াজ নিয়ে বলা হয় যে – “প্রায় নাবিকদের মুখে এই কথা শুনা যেত, অভিশাপ বহনকারী এই জাহাজটিকে তারা দেখেছে। তারা এ সময় ফ্লাইং ডাচম্যান জাহাজ নিয়ে বলেন, Cape of Good Hope শেষবারের ডাচম্যানদের যুদ্ধে তারা এই জাহাজটি দেখে। দূরে সমুদ্রে দাঁড়িয়ে থাকা এই জাহাজটি থেকে মহোনিয় এক মৃদু সঙ্গীত ভেসে আসতে শোনা যায় এবং সেই সুর আর জাহাজের আকৃতি দেখলেই মনে হবে যেন জাহজটি এখনই ছুটে এসে সবকিছু লন্ড ভন্ড করে দেবে। এরপর এক টুকরো কালো মেঘের মধ্যে এই জাহাজ হারিয়ে যায়” ! এর পর John Leyden (1775-1811) তাঁর অপরাধ প্রবণতামূলক এক গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ্য করেছিলেন যে, 

“It is a common superstition of mariners, that, in the high southern latitudes on the coast of Africa, hurricanes are frequently ushered in by the appearance of a spectre-ship, denominated the Flying Dutchman … The crew of this vessel are supposed to have been guilty of some dreadful crime, in the infancy of navigation; and to have been stricken with pestilence … and are ordained still to traverse the ocean on which they perished, till the period of their penance expire.”

ঐ বছরে বা ১৮২১ সালের মে মাসে Blackwood’s Edinburgh Magazine তাদের প্রথম পাবলিকেশনে ফ্লাইং ডাচম্যান জাহাজ সম্পর্কিত তথ্যে প্রকাশ করে যে–

“সম্ভবত বহুল আলোচিত এই ভৌতিক জাহাজটি ডাচ রাজধানী আমাস্টারডামের ছিল। যাআজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে সমুদ্রে যাত্রা করেছিল,এবং জাহাজটির মাস্টারের নাম ছিল Van der Decken । ধারনা করা হয় জাহাজের মাস্টারটি  ছিল পিশাচ উপাসক এবং শয়তানের একান্ত ভক্ত। তার অধিনস্ত কোনো নাবিক তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারে না। গল্পটি আসলে এমন যে, কেপ অতিক্রম করার সময় তারা ঝড়ের সম্মুখীন হয়। প্রলংকারী এই ঝড় দেখে তখনকার জাহাজের মাস্টার Van der Decken জাহাজের ডেকে আসেন। এই সময় সামনে উপস্থিত আর একটি জাহাজ থেকে নাবিকরা তাকে তীরে যেতে বললে সে উত্তর দেয়, 

“May I be eternally damned if I do, though I should beat about here till the day of judgment.” এবং এই কথা বলার পর পরই নাবিকদের নিয়ে জাহাজটি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত এই বিশ্বাসটাই করা হয় যে, সেদিন জাহাজটি মিলিয়ে যাবার পর থেকে কোনো বন্দরে আর জাহাজটি নোঙ্গর ফেলেনি। এবং সমুদ্রে এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ এই জাহাজকে দেখতে পায় না !

শেষের কথা

ফ্লাইং ডাচম্যান নিয়ে প্রচলিত কাহিনীগুলো এখনো অনেক নাবিক বিশ্বাস করেন। এবং জাহাজটিকে সমুদ্রের অভিশাপ হিসাবে তাদেরকে গণ্য করেন। আসলে কে ছিলেন সে জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং কারা সেই নাবিক, তাদের পরিচয় আজও পাওয়া যায়নি। তবে একঘে‍ঁয়ে জীবনে সত্যের বাইরে যে সকল কথা থাকে, তা না জানাই ভালো। 

তথ্য সুত্রঃ

 

Exit mobile version