1. sjranabd1@gmail.com : S Jewel : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
গোপাল ভাঁড় নামে বাস্তবে কি সত্যিই কেউ ছিলেন ? - কালাক্ষর
শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর ২০২১, ১০:০৬ পূর্বাহ্ন

গোপাল ভাঁড় নামে বাস্তবে কি সত্যিই কেউ ছিলেন ?

  • Update Time : রবিবার, ২৭ জুন, ২০২১
গোপাল ভাঁড়
কাল্পনিক গোপাল ভাঁড়। ছবি - সংগ্রহীত

সৃজনশীল ব্লগ কালাক্ষর এ আজ আমরা বাংলার গন মানুষের প্রিয় এক চরিত্র গোপাল ভাঁড় এর বিষয়ে আলোচনা করবো। আচ্ছা আপনার মনে কি কখনো প্রশ্নের উদয় হয়েছে গোপাল ভাঁড় আসলে কে ছিলেন? রুপ কথার পাতায় ঠাই নেওয়া এই চরিত্রের কি বাস্তবে অস্তিত্ব ছিল? নাকি পুরোটাই কাল্পনিক মিথ থেকে নেওয়া? যদি বাস্তবে গোপাল ভাড়ের অস্তিত্ব থাকে তবে তার কর্মক্ষেত্র কোথায় ছিল? যে রাজার সাথে গোপাল ভাঁড়ের বুদ্ধির প্রতিযোগীতা হত সেই রাজা কৃষ্ণ চন্দ্র ই বা কে ছিল? আর তার রাজত্ব ই বা কোথায় ছিল? পুরো আলোচনায় যাবার আগে চলুন গোপাল ভাড়ের উপস্থিত বুদ্ধি এর উপর একটা ঘটনা জেনে নেই –

একদিন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর সব সভাসদদের সামনে গোপাল ভাঁড়কে জব্দ করার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “বুঝলে গোপাল, আমার সাথে তোমার চেহারার কিন্তু দারুণ মিল! তা বলবে কি? তোমার মা- আমার বাবার শাসনামলে রাজ মহলের এদিকে আসতেন-টাসতেন নাকি?” রাজার কথা শুনে গদগদ হয়ে গোপাল বললেন, ‘আজ্ঞে না রাজামশাই। তবে মা না এলেও বাবা কিন্তু এই দিক প্রায়শই আসতেন!’

গল্পটি পড়ে নিশ্চয়ই আপনাদের বুঝতে বাকি নেই, রাজাকে এভাবে তীক্ষ্ণবুদ্ধির মার দেওয়া মাথায় টাকপড়া, পেট মোটা বেটে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি গোপাল ভাঁড়ের উপস্থিত বুদ্ধির জোড় কেমন ছিল? যাই হোক এবার চলুন মূল আলোচনায়

গোপাল ভাঁড় কে ছিলেন?

গোপাল ভাঁড় ছিলেন মধ্য যুগে নদিয়া অঞ্চলের রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের রাজ সভার প্রখ্যাত মনোরঞ্জনকারী। গোপালের তাঁর আসল নাম গোপাল চন্দ্র প্রামাণিক। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়া জেলার প্রখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ সভায়  মনোরঞ্জন কারী হিসেবে গোপাল নিযুক্ত হন। পড়ে রাজা তাঁকে  সভাসদদের একজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের পরিচয়

গোপাল ভাঁড়ের সাথে প্রায় সব সময় যে রাজার ঘটনা উল্লেখ করা হয়ে থাকে তাঁর নাম রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের (১৭১০-৮৩) রাজত্বকাল ছিল ৫৫ বছরের। ১৭২৮ সালে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ১৮ বছর বয়সে নদিয়ার সিংহাসনে বসেন। কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও শিল্প-সাহিত্যানুরাগী। যদিও ১৭৫৭-তে পলাশীর প্রেক্ষাপটে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাতের দায়ে ইতিহাসে তিনি ‘বেইমান’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, তবু এতে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথা অস্বীকার করা যায় না। রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের  সভাসদ ছিলেন মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন, জগন্নাথ তর্ক পঞ্চানন, হরিরাম তর্কসিদ্ধান্ত প্রমুখ। 

গোপাল ভাঁড়ের অস্তিত্ব নিয়ে কথা

এই কৃষ্ণচন্দ্রের সভার অনেক রত্নের এক রত্ন ছিলেন গোপাল ভাঁড়—এমন বক্তব্য পণ্ডিতদের। এ বিষয়ে তাঁরা স্থির সিদ্ধান্তে না এলেও এই মতের পক্ষেই রয়েছে অধিকাংশের সায়। যেমন বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা বইয়ে অজিতকুমার ঘোষ গোপাল ভাঁড় সম্পর্কে লিখেছেন, ‘রসিক-চূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভায় গোপাল একজন ভাঁড় ছিলেন।’

গোপালকে নিয়ে বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, আর অন্যান্য সাইট ঘেঁটে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তা হলো – গোপাল ভাঁড়ের গল্প মুখে মুখে, লোককথায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে অনেকদিন থেকে চলে এলেও গোপালের নাম জনপ্রিয় হয় প্রধানত উনিশ শতকের প্রথম দিকে। সে সময় কলকাতার বটতলায় গোপালের প্রথম বই প্রকাশিত হয়। নদীয়ার স্বনামধ্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় -এর সভার ভাঁড় নানা সময় নানা সমস্যার সমাধান গল্পে গল্পে করে দিতেন। এজন্য তিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিশেষ প্রিয়পাত্র ছিলেন।

তবে এই ইতিহাস নিয়েও সন্দেহ আছে। অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় গোপাল নামক কারো উপস্থিতির প্রমাণ কোনো দলিলে পাওয়া যায়নি। তো, গোপাল ভাঁড়ের অস্তিত্বের সন্ধান করতে গিয়ে গবেষকরা নানা প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। গোপালের জন্ম কত বঙ্গাব্দে তা কোথাও লেখা নেই। তার জন্মস্থানের পক্ষেও কোনো নথি নেই। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা হিসেবে তার সম্পত্তির কিংবা জায়গা-জমির কোনো নথি পাওয়া যায় না। নগেন্দ্রনাথ দাস বিরচিত নবদ্বীপ কাহিনি দাবি করে, গোপালের বাবার নাম জানা গেলেও তার মা ও স্ত্রী সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

গোপালের ছবি কেউ কখনো দেখেনি। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পঞ্চরত্নসভার রাজকবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর মহারাজ, তার রাজত্ব ও সভাসদদের নিয়ে যে কাব্যগ্রন্থ লিখে গেছেন সেখানেও তিনি গোপাল ভাঁড়ের কোনো নাম উল্লেখ করেননি। এমনকি কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির মহাফেজখানায় গোপালের অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ কোনো দলিল দস্তাবেজ নেই।

গোপাল ভাঁড়ের ছবি বলতে কেবল মাত্র কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে একটি অয়েল পেইন্টিং রয়েছে, যেখানে গোপালের সাথে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রও রয়েছেন। তবে তা নিয়েও ঐতিহাসিক মহলে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ ঐ সময়ের কোনো বই-পুস্তক দলিল দস্তাবেজে গোপাল ভাঁড়ের কোনো নাম পাওয়া যায় না, এমনকি এত পন্ডিত বলে খ্যাতি পাওয়া গোপাল ভাঁড়ের নিজের লেখাও কোনো বই নেই।

গোপাল ভাঁড়ের প্রায় সব গল্পই আত্মজীবনীমূলক। চরিত্র হিসেবে কতদিনের পুরোনো এই গোপাল ভাঁড়? খুব বেশি হলে ৩০০ বছর। নবদ্বীপ কাহিনি বা ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়’ বইটির লেখক নগেন্দ্রনাথ দাস গোপাল ভাঁড়ের একটি বংশ-তালিকা প্রকাশ করেছিলেন। সেই তালিকায় গোপাল ভাঁড়ের পিতামহ, পিতা ও বড় ভাইয়ের নাম পাওয়া যায়। আর গোপাল ভাঁড়ের গল্পগুলোতে তার মা, স্ত্রী ও কন্যার প্রসঙ্গ রয়েছে নানাভাবে।
নগেন্দ্রনাথ দাস বলছেন, গোপাল ভাঁড় আসলে ছিলেন গোপালচন্দ্র নাই। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাকে রাজভাণ্ডারি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে গোপালচন্দ্র ভাণ্ডারি হাস্যার্ণব উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। পড়ে ওই ভাণ্ডারি শব্দটিরই অপভ্রংশ থেকে ভাঁড় হয়ে সবার মাঝে পরিচিতি পেয়েছে।

হাস্যরস সৃষ্টিকারী প্রচন্ড উপস্থিত বুদ্ধি সম্পন্ন গোপালের পদবী ছিলো ‘নাই’। ‘নাই’ শব্দের অর্থ নাপিত। এ থেকে ধরে নেওয়া হয় গোপাল ছিল নাপিত বংশজাত। ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ সুকুমার সেন গোপাল ভাঁড়ের এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘গোপাল ভাঁড় সম্পর্কে আধুনিক বাঙালির মনে প্রচুর কৌতুহল থাকার ফলে বাস্তব অথবা কল্পিত এই ব্যক্তিটির সম্পর্কে যে জনশ্রুতি জাতীয় ঐতিহ্য গজিয়ে উঠেছে ও উঠছে তার বীজ হচ্ছে ভাঁড় নামের অংশটি। গোপাল ভাঁড়ের ভাঁড়টুকু সংস্কৃত শব্দ ভাণ্ডারের ‘ভাণ্ড’-জাত মনে করে অনেক গোপালের জাতি নির্ণয় করেছেন। নাপিতের জাতি ব্যবসায় ভাঁড়-ক্ষুর নিয়ে। সুতরাং গোপাল ভাঁড় এক জন নাপিত ছিলেন।’

যতদূর জানা যায়, গোপালচন্দ্রের অসামান্য বুদ্ধি গুণে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র অনেকবার নবাব সরকারের কাছে ঘোর বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন। তার বাক্য প্রয়োগে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। ভগবত ও পুরাণে তার যথেষ্ট দখল ছিল, রামায়ণ-মহাভারত আদ্যপান্ত ছিল তার মুখস্থ। এমনকি রাজনীতি ও সমাজনীতিতেও তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। মহারাজের কৃপায় কৃষ্ণনগরের ধনী ব্যক্তি হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হতো। উপরন্তু, তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও চরিত্রবান। ফলে মহারাজা ও মহারাণী তাকে সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন বলে গবেষকদের দাবি। গোপালের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে ছিল। মেয়ের নাম রাধারানী। তার দুই পুত্র রমেশ ও উমেশ। কিন্তু তার এক পুত্রের খুব অল্প বয়সেই মৃত্যু হয়।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গোপালের বিয়ে ও মৃত্যু নিয়ে ইতিহাস ভীষণ চুপচাপ। তো, বহুচর্চিত এই রসিক সম্বন্ধে ইতিহাসের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম কী বলেছেন, এবার টুকে নেওয়া যাক সেটুকু, কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষক হিসেবে শঙ্কর তরঙ্গ নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। হয়ত তিনিই পরবর্তীকালে গোপাল ভাঁড় হিসেবে কল্পিত হয়েছেন। 

শেষের কথা

গোপাল ভাঁড়ের আরেকটি গল্প দিয়ে আজ আমার আজকের লেখার ইতি টানবো-গোপাল ভাঁড় কে একবার তাঁর গ্রামের মোড়ল  বানানো হয়েছিল।  মোড়ল বানানোর পর একদিন খুব সকালে এক লোক গোপালের বাসার সামনে এসে ডাকতে লাগল, ‘গোপাল? গোপাল?’ গোপাল ভাঁড় কোনো উত্তর না দিয়ে শুয়েই রইল। এবার লোকটা চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘মোড়ল সাহেব, মোড়ল সাহেব।’ এবারও গোপাল কোনো কথা না বলে মটকা মেরে শুয়ে রইল। লোকটি ডাকা ডাকিতে গোপালের বউ বিরক্ত হয়ে গোপাল কে বলল, ‘কী ব্যাপার, লোকটা মোড়ল সাহেব মোড়ল সাহেব বলে চেঁচিয়ে পড়া মাত করছে, তুমি কিছুই বলছ না!’ গোপাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আহা, ডাকছে যখন তখন আর কিছুক্ষন ডাকুক না, পাড়ার লোকজন জানুক আমি মোড়ল হয়েছি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!