1. sjranabd1@gmail.com : S Jewel : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
ভুটানের নিষিদ্ধ জগত ‘দ্রায়াং’ - কালাক্ষর
মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ০৬:৩৪ পূর্বাহ্ন

ভুটানের নিষিদ্ধ জগত ‘দ্রায়াং’

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১
দ্রায়াং
দ্রায়াং এর ভিতরে দৃশ্য। ইমেজ সোর্স - buoyantfeet.com

কোনো দেশে ঘুরতে যাবার পর সবার প্রথমেই আমাদের মাথায় যে ভুতটি চাপে, তা হল, সেই দেশের আঁধারঘেরা গোপন জায়গাগুলো খুঁজে বের করা। আর এই কারণে পর্যটন শিল্পে প্রাধান্য দেওয়া প্রায় দেশেই পর্যটক প্রাধান্য দেওয়া হট স্পট গুলোর আসে পাশে এই জাতীয় পোপন বা সিক্রেট স্পট গুলো গড়ে উঠতে দেখা যা। কিন্তু ভুটান? চরম রক্ষনশীল জাতি হিসেবে ভুটানে যদি যান তবে কি হবে? ওখানে তো সিগারেট টা পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে খাওয়াই যায় না। এই খানে নিষিদ্ধ জায়গা? আছে জনাব, ভুটানেও আছে। আর এর নাম দ্রায়াং। দ্রায়াং হচ্ছে ভুটানের নিষিদ্ধ জায়গা। ঠিক যেমন বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জায়গাগুলো হচ্ছে বার বা মদের দোকান, নাইটক্লাব অথবা দৌতলদিয়া পতিতালয় বলে আমরা মনে করি তেমনি ভুটানিজদের কাছে দ্রায়াং প্রায় সে রকম ই।

এমনিতেই ভুটান অনেক নিয়মকানুনে বাধা একটি দেশ। এর কারণ এদের সংস্কৃতি। ভুটানিরা নিজেদের সংস্কৃতিকে খুবই প্রাধান্য দেয়। আপনি শুনলে অবাক হবেন,ভুটানে পাবলিক প্লেসে একটা সিগারেট পর্যন্ত খাওয়া যায় না। পুরো ভুটানেই সিগারেট নিষিদ্ধ। আর মদ, পতিতা তো আরো অনেক বড় ব্যাপার ! আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে,তাহলে কি ভুটানে অন্ধকার গলি নেই? অবশ্যই আছে। আর সেই অন্ধকার গলির শেষ ঘরই হল দ্রায়াং (Drayang) ! 

দ্রায়াং

দ্রায়াং এর ভিতরে দৃশ্য। ইমেজ সোর্স – buoyantfeet.com

অপরিচিত দেশ ভুটানে গিয়ে রাস্তাঘাটে কাউকে দ্রায়াংয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে তারা আপনাকে পাগল ভাবতে পারে। কারণ সভ্য সমাজে দ্রায়াং তাদের কাছেও এক লজ্জার নাম। অথচ দ্রায়াংয়ে ঢুকার পর আপনার মনেই হবে না, এখানে খারাপ কিছু হয়। বরং আপনার মনে হবে এ কোথায় আসলাম! দ্রায়াং এ তো লজ্জায় মাথা চাপড়ানোর মত নিষিদ্ধ কিছুই হয় না ! তার পরেও কেন ভুটানিজরা এই জায়গার সন্ধান দিতে এত লজ্জা পায় ! কারণ এটাই ওদের নিয়ম। অত্যন্ত ভদ্র জাতি হিসেবে এরা সামান্য কিছু নিয়েও লজ্জায় পড়ে, তাই হয়ত এরা দ্রায়াং এর ব্যাপারেও লজ্জায় থাকে-

দ্রায়াং কি?

সোজা বাংলা ভাষায়, দ্রায়াং হল ভুটানের অন্ধকার রজনীর বাতিঘর! আমাদের প্রচলিত সমাজের একাকী মানুষগুলোর বিনোদনের একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বার বা নাইট ক্লাব। আমাদের মত দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে এটি অন্ধকার জগত হিসেবেই ব্যাপকভাবে উল্লেখিত। ঢাকার একটি বার বা নাইটক্লাবে সাধারণত সমাজের নিম্মশ্রেণীর লোক থেকে শুরু করে ছাত্র, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ সহ সব শ্রেণীর লোকদেরই দেখা পাওয়া যায়। ছোট ছোট উশৃঙ্খল জামা পরে মেয়েরা নাচে। অশীলান মুভ দিতে দেখা যায় তাদের। এরসাথে ভুটানের দ্রায়াং এর পার্থক্যটা হচ্ছে, সেখানে সমাজের উচ্চবিত্ত, মিডেল ক্লাস, শিক্ষিত শ্রেণীর সব বয়সের নারীপুরুষরাই যান। এবং এখানে ভালগারিটি বলে কোন কিছুর লেশ মাত্র  নেই। কোনো নোংরামি হয়না সেখানে !

বিদেশি নাইটক্লাব গুলোতে দেখবেন মেয়েরা যেমন বিকিনি বা ওই ধরণের অশালীন জামা পরে নাচে, কিন্তু ভুটানের দ্রায়াংয়ে তেমন কিছুই হয় না। তবে দ্রায়াংয়ে নাচার জন্য মেয়ে থাকে না তা কিন্তু নয়। দ্রায়াং এও নাচের জন্য মেয়ে থাকে তবে তারা অশালিন ড্রেস এর বদলে ভুটানের ট্রেডিশনাল “কিরা” ড্রেস পরেন। অত্যন্ত মার্জিত একটি ড্রেস। তবে এতে তাদের দেখতে একটুও বোরিং লাগেনা। ভদ্রতার মধ্যে থেকেও যে নাইটক্লাবে নেচে কাস্টোমারদের আনন্দের খোরাক জোগানো যায়, ভুটানের দ্রায়াং তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ !

ভুটানের দ্রায়াংয়ে আমাদের দেশের বারগুলোর মত উচ্চস্বরে ডিজে মিউজিক বাজায় না। বরং তারা ঠান্ডা সূরের ভুটানিজ রোমান্টিক মিউজিক বাজায়। এতে দ্রায়াংয়ের ভেতরকার পরিবেশও ঠান্ডা থাকে। রোমান্টিক এই সব গানের সূরেই দ্রায়াংয়ের মেয়েরা নেচে মাতিয়ে তোলে মদ খেতে আসা যুবকদের মন !

আর এই বিনোদনকে অন্য লেভেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য দ্রায়াংয়ে আলাদা কোনো গোপন কক্ষ থাকেনা। এইসব দিক থেকে তারা অত্যন্ত মার্জিত। অথচ আমাদের দেশের ক্লাব বা বারগুলোতে গেলে আপনি সামান্য পয়সা স্টাফদের পকেটে ঢুকিয়ে দিলেই মেয়ে নিয়ে সময় কাটানোর জন্য আলাদা কক্ষ পাবেন। এটাই মূলত আমাদের সমাজ নষ্ট করার কারণ। যে বিনোদনটা সুন্দর হতে পারত, আমরা নিজেরাই তাকে বিকৃত বানিয়ে ফেলেছি। এটাই আমাদের সাথে ভুটানের সবচেয়ে বড় পার্থক্য ! শুধুমাত্র আমরাই না, সাউথ এশিয়ার অনেক দেশের সাথে ভুটান এদিক থেকে পুরটাই আলাদা !

দ্রায়াং

দ্রায়াং এর ভিতরে দৃশ্য। ইমেজ সোর্স – buoyantfeet.com

আপনি যদি দ্রায়াংয় ঢোকেন,তখন দেখবেন ডান্স ফ্লোরে নাচতে থাকা কোনো একটি মেয়ে আপনাকে এসে জিজ্ঞেস করছে, আপনার কি কোনো পছন্দের গান আছে? যদি থাকে তারা আপনার সেই পছন্দের গান বাজিয়ে তার তালে তালে আপনাকে নেচে দেখাবে। খুশি হয়ে আপনি যদি কিছু টাকা দেন, এই টাকা দিয়েই তাদের সংসার চলবে। কিন্ত আপনাকে যে বাধ্যতামূলক টাকা দিতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। টাকা দেয়ার জন্য তারা আপনার কাছে জোরও করবেনা, এমনকি টাকা চাইবেও না !

ভুটানের দ্রায়াংয়ের খদ্দেররা কখনোই মদ্যপ অবস্থায় এই মেয়েগুলোকে উত্যক্ত করেন না বা যৌনকর্মের জন্য প্রস্তাব দেন না। নীতিগতভাবে তারা অনেক অনেক বেশিই উন্নত। নারীকে তারা ভোগ্যপন্য মনে করেন না। যদি বিষন্নতা বলে কিছু না থাকত, তাহলো হয়ত ভুটানিজরা দ্রায়াংয়েও মেয়েদের নাচতে দিতেন না। এতটাই মার্জিত জাতি তারা !

তাহলে কি দ্রায়াংয়ে পতিতাবৃত্তি একেবারেই নেই? মানুষ কি দ্রায়াং এ শুধুমাত্র মদ খেতে আর এখানকার মেয়েদের ট্রাডিশনাল নাচ দেখতেই আসেন? এর উত্তর জানতে যদি একটু গভীরে জান,তবে জানা যাবে, দ্রায়াংয়ে নাচা বেশিরভাগ মেয়েরাই ভুটানের একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা,অত্যান্ত দরিদ্র ঘরের মেয়েরা এখানে কাজ করে যাদের খুব একটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা অক্ষর জ্ঞান নেই। এরা ভালো কোনো জায়গায় চাকরি না পেয়ে দ্রায়াংয়ে কাজ নেয়। দ্রায়াং এর  রোজগারের টাকা দিয়েই তাদের পুরো পরিবার চলে। তারা দ্রায়াংয়ে কাজ করতে ভালোবাসে, কারণ এখান থেকে তারা মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পান। এবং মালিকরাও তাদের খারাপ লোকদের হাত থেকে সুরক্ষা দেন।

আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে দ্রায়াং এ খারাপ কাজ যদি নাই হয়, তবে ভুটানিজ সমাজের কাছে এটি নিষিদ্ধ জায়গা হিসেবে পরিচিত কেনো? তা যদি খুজতে যান তবে বলি, ভুটানিরা খুব ভদ্র জাতি। তাই মদ খাওয়া বা ক্লাবে নাচার মত সামান্য ব্যাপারকেও এরা খুব বড় করে দেখেন। এই কারণে এদের কাছে  দ্রায়াংয়ের ব্যাপারটাও ট্যাবুর মত। দ্রায়াং এ যদিও পতিতাবৃত্তির মত কিছুই ঘটেনা, তার পরেও ভুটানের মুরব্বিরা মনে করেন নিশ্চয়ই এখানে ওরকম কিছু না কিছু হয় ! এই কারণে অধিকাংশ ভুটানিজ দ্রায়াং কে অন্ধকারাচ্ছন্ন জগত হিসেবে মেনে নিয়েছে !

 

তথ্যসুত্রঃ

  • https://buoyantfeet.com/2017/02/01/drayang-the-dark-secret-of-bhutan/

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!