1. sjranabd1@gmail.com : Rana : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
তাস খেলার ইতিহাস - ( প্রথম পর্ব ) - কালাক্ষর
শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ০৩:১৪ অপরাহ্ন

তাস খেলার ইতিহাস – ( প্রথম পর্ব )

  • Update Time : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২০
তাস এর বিবি । ছবি - কালাক্ষর ডেক্স
তাস এর বিবি । ছবি - কালাক্ষর ডেক্স

তাস খেলার ইতিহাসঃ

সোলায়মান জুয়েলঃ জীবন দশায় তাস খেলে নাই এমন মানুষ খুজে পাওয়া দায়,কারন ইনডোর গেম গুলোর মধ্যে দুনিয়াময় সুখ্যাতি অর্জন করার মত একটি খেলা হলো তাস খেলা। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষই তাদের জীবন চক্রে অন্তত পক্ষে এক দিনের জন্য হলেও তাস খেলেছেন, নয়ত খেলা দেখেছেন বলেই আমার ধারণা- আপনি ভার্সিটিতে পড়েছেন অথচ খেলাচ্ছলে জীবনে কখনো তাস হাতে নেননি এমন মানুষ তো সত্যিই বিরল। আজকের কালাক্ষর ব্লগের পোস্ট মর্টেম এই অতী জনপ্রিয় তাস খেলার উপরেই 

এক সেট তাসে মোট ৫২ টি তাশ থাকে,আর এই ৫২ তাশে ৫৩ রকমের খেলা যায়,এই ৫২ টি তাশ যা আবার চার ভাগে বিভক্ত। সেগুলো হলোঃ ইস্কাপন, হরতন, রইতন এবং চিড়তন। আমরা সবাই হয়তো কম-বেশি এই নাম গুলো জানি। কিন্তু আমরা কি এই নাম গুলোর নামকরনের ইতিহাস কেউ জানি? তাসের এই ইস্কাপন, হরতন, রইতন, চিড়তন এর প্রতীকী নাম গুলো কোথা থেকে আসলো আর এর অর্থ ই বা কি ? কিংবা আমরা কি জানি তাশের এই প্রতীক গুলোর পিছনের ইতিহাস?

কিংবদন্তি আছে মিসেস হচকিস নামে ইংল্যান্ডের লীডস শহরের একজন অধিবাসিনী ছিলেন । প্রায় এগারো বছর ধরে তিনি পঙ্গু হয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় ছিলেন। তার চলন শক্তি তো ছিলই না, কথাবার্তা ঠিক মত বলতে পারতো না- তবে তার জ্ঞান ছিল। এগারো বছর বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি নিজের একাকিত্ব দূর করতে একার্তে তাস খেলতেন। ১৭৯৫ সালে হঠাৎ তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও তাঁর হাতে ছিল রুহিতনের সাত।  কিন্তু দাফন করার আগে হাত থেকে সেই রুহিতনের সাত যখন কিছুতেই আলাদা করা গেল না তখন সেই অবস্থাতেই তাঁকে কফিনে সমাধিস্থ করা হয়।

তাস খেলা একটি ভয়ংকর নেশা। কারন এই খেলার আসক্তির কারনে খোদ আমাদের দেশেই অনেক সামাজিক বিশৃঙ্খলতা দেখা যায়- বাবা তার ছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে – বা বউ তার জামাইকে তাশ খেলার নেশা থেকে ফেরাতে পারেনী বলে অনেক ঝগড়া ঝাটি মান অভিমান ও করতে দেখা যায়।

মার্কিন ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট একবার বলেছিলেন, ‘আমি  তাশ (ব্রিজ) খেলি , তখন আমার পাশ দিয়ে যদি একজন সুন্দরী নারী নগ্ন হয়ে হেটে যায়,তখন আমি তার দিকে ফিরেও তাকাব না।’ শুধু ওয়ারেন বাফেটই না, আরেক শীর্ষ ধনী মাইক্রো সফট এর মালিক জনাব বিল গেটস সহ আমেরিকার আরও অনেক শীর্ষপর্যায়ের ব্যাক্তিই নানান সাক্ষাৎকারে তাদের তাস খেলার আসক্তির কথা বিশেষ করে তাশের ৫৩ খেলার এক খেলা  ইন্টারন্যাশনাল ব্রীজ নামে তাসের একটি জনপ্রিয় খেলার কথা বার বার বলে গেছেন। আপনি কি জানেন ? ১৯২৯ সালে এই ব্রীজ খেলাকে কেন্দ্রই করে আমেরিকায় ঘটে গিয়েছিল একটি ভয়াবহ খুনোখুনির ঘটনা।

মার্টল বেনেট নাম্নী একজন মহিলা তার নিজের পছন্দ সই ভাবে না খেলার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের স্বামীকেই খুন করে বসেছিলেন । লরেন্স অফ এমেরিকা সিনেমার  অভিনেতা জনাব ওমর শরিফ তো তাস খেলার উপরে এতটাই আসক্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি বিখ্যাত পত্রিকা “শিকাগো ট্রিবিউনে “ তাশের ইন্টার ন্যাশনাল ব্রীজ খেলার উপর নিয়মিতভাবে কলাম লিখতেন এবং পরবর্তীতে  অভিনেতা ওমর শরিফ ব্রীজ সার্কাস শ্লোগান নিয়ে একবার বিশ্বভ্রমণেও বের হন। বিয়ার স্টার্ন নামে নিউ ইয়র্কের শীর্ষ বিনিয়োগ ব্যাংকের সাবেক প্রধান জিমি শেইন একজন জাতীয় ব্রীজ চ্যাম্পিয়ন। জনাব জিমি শেইন নিক নিকেল নামে এক জনের সঙ্গে জুটি বেধে একবার আয়োজন করেছিলেন ‘কর্পোরেট আমেরিকা বনাম কংগ্রেস’ ব্রীজ খেলার ম্যাচ।

নিক নিকেল ছিলেন আমেরিকার ব্রিজ লিগ অঙ্গনের একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। কর্পোরেট আমেরিকার পক্ষে সেই সময় জিমি সেইন ও নিক নিকেল দলে ভিড়িয়েছিলেন সাবেক সিবিএস নির্বাহী লরেন্স টিচ ও বিয়ার স্টার্নের তৎকালীন সভাপতি জনাব অ্যালান গ্রীনবার্গকে। তারা মুখোমুখি হয়েছিলেন আমেরিকার নামি দামী খেলোয়ারের সাথে। বরাবরের মতো এই লিগে চাম্পিয়ান এর তকমা গায়ে উঠেছিল কর্পোরেট আমেরিকার।

একবার ইংল্যান্ডের রাজা জেমস তার প্রাসাদে সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের এক জন স্যার আইজাক নিউটন এবং ইংল্যান্ডের রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট জ্যোতির্বিদ হ্যালিকে নিমন্ত্রণ করেন। এবং ডিনারের পর যথারিতি তাদের মধ্যে তাস খেলা শুরু হয়। তাদের এই তাসগুলি ছিল অ্যাষ্ট্রনমিক্যাল কার্ড। তখন এই তাসের গায়ে বিভিন্ন নক্ষত্রপুঞ্জের ছবি আঁকা ছিল। তাদের এই তাস খেলার স্মৃতি হিসাবে রুহিতনের তিরি জেমসের প্রাসাদে সারক হিসাবে রাখা হয় । এবং পরে এটি অ্যাষ্ট্রনমার হাসেলকে দেখানো হয়। হাসেল সাহেব তাস খেলার মাথা মুন্ডু কিছু জানতেন না। তখন ছবিতে আঁকা তারাগুলি তাঁর মনঃপূত না হওয়ায় তিনি রাজা জেমস কে তাস খেলা নিয়ে তার বিখ্যাত উক্তি বলে ফেলেন, ‘Why didn’t the artist make five points to the stars? there is no use upsetting the convention!’

পঞ্চদশ শতকের গোড়ার দিকে চিনে প্রথম তাস খেলার ব্যাপক প্রচলন ঘটে । যদিও খ্রিস্টীয় নবম শতকের দিকে টাং রাজার রাজত্বকালে তার প্রসাদের অন্তঃপুরবাসী রানীরা এই তাস খেলে সময় কাটাতেন। কিন্তু তা জন সাধারনের মধ্য ব্যাপক আকারে প্রচলিত হয় নি- কিন্তু পঞ্চদশ শতকে হুট করেই এই খেলা রাজ প্রাসাদের প্রকষ্ট ছেড়ে জন সাধারনের সাধারন খেলায় রুপ নিয়ে ন্যায়- যদিও তখন অবশ্য খেলার তাস হিসেবে পয়সা ও প্লেট ব্যবহার করা হতো। যাই হোক, এর পর এই খেলা চিনের গন্ডি পেরিয়ে দ্রুত ভারতবর্ষেও  ছড়িয়ে পড়ে এবং খেলার তাস হিসেবে তখন রিং, তলোয়ার, কাপ ইত্যাদি ব্যবহার করা হত। তবে ৫২ তাসের খেলা প্রচলন হয় মিশর থেকে। এসময় মিশরীয়রা এই তাস চারজন মিলে তাস খেলত।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চারজন মিলে যেভাবে তাস খেলা হয়, তার প্রচলন মিশর থেকে শুরু হয়েছিল । অতিতে তাস খেলা কিন্তু সর্ব সাধারনের খেলা ছিল না-   ঊনবিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত এই খেলা রাজপরিবার এবং সৈন্য-সামন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে এর গায়ে রাজকীয় খেলার তকমা শাটা হয়। আধুনিক তাস খেলার বিবর্তন এর সাথে জার্মান জাতীর নাম জরিয়ে আছে- কারন জার্মানির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাসের নামের পরিবর্তন করা হয়। ক্ষমতার ক্রম অনুযায়ী তখন তাসের নাম দেওয়া হয় রাজা-রানী, জোকার ইত্যাদি। বর্তমানে এই তাস খেলা এত বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, তাস খেলা বাস্তব দুনিয়া ছেড়ে ভার্চুয়াল জগতেও মানে মোবাইল ও কম্পিউটারের ভেতরেও ঢুকে গেছে।

প্রাচীন কালে চীন থেকে সিল্ক রোডের মাধ্যেমে বিভিন্ন দেশে মালামাল আনা নেওয়া করা হত – কিছু মানুষ চিন থেকে এই মালামাল বিভিন্ন দেশে নিয়ে যেত অথবা বাণিজ্যিক কারণে যারা চীনে আসত তাদের মাধ্যমে তাস খেলা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তদানন্তিন মামলুক শাসকরা এ খেলার নাম দিয়েছিল ন্যাব, নাইবি অথবা নাইপ। মিশর তখন মামলুকদের দ্বারা শাসিত হত, আর এই মামলুক রাজা রাই মিশরে বায়ান্ন তাস দিয়ে তাস খেলার প্রচলন করে; মামলুক রা মিশরে ৫২ তাসের প্রচলন করলেও তাদের তাসের প্রতীকগুলো ছিল ভিন্ন টাইপের । মামলুক রা  ১-১০ নং কার্ডকে কোর্ট কার্ড হিসেবে ধরে- কিং কুইন এবং ভিজির চিহ্নিত একটি করে কার্ডও রাখত। ভিজির হল রুশ শব্দ, এর অর্থ হল উজির। তখন কার মামলুক সম্রাটের কোনো এক উজিরের নাম ছিল নাইয়িব। নাইয়িব সাহেব এ খেলার বেশ ঘটা করে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বলে মিশরে তার নাম অনুসারে ন্যাব, নাইবি অথবা নাইপ নামে এই খেলার নাম প্রচলিত হয়ে যায়।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপের দেশগুলোতে তাস খেলার প্রচলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে ইউরোপীয় শাসকরা বিরক্ত হয়ে একে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কারণ ওই সময় এ খেলাটি বিনোদনের উপকরেন মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাপকভাবে জুয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে; কিন্তু ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের সেই নিষেধাজ্ঞা মোটেই কার্যকর হয়নি। বরং জোহানবার্গের প্রিন্টিং মেশিন আবিষ্কারের ফলে বিপুল পরিমাণের তাস ছাপানো হয় এবং এই তাস ইউরোপীয় প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায় । তাই শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় শাসকবর্গ এর এটাকে গ্রহণ করে নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকে না। 

এর সঙ্গে সঙ্গেই গামবুলিংও অলিখিতভাবে স্বীকৃত হয়ে যায়। আধুনিক তাসের প্রতীকগুলো হল দৃশ্যমান কিছু ছবি। এতে চার টি ক্যাপশন – হরতন, ইশকাপন, রুহিতন ও চিড়িতন থাকে। এই ক্যাপশন মানে প্রত্যেকটি গ্রুপেই রাজা, রানী এবং গোলাম আছে এবং এর সঙ্গে নির্দিষ্ট নম্বর মারা প্রত্যেকটি রঙ এবং প্রতীকের কিছু তাস থাকে। অবশ্য বিশ্বের প্রতিটি দেশে যেখানে তাস খেলা হয় সেই খানে তাশের একই প্রতীক নিয়ে বা তাসগুলোর মান ও নাম একই রকমভাবে করা করা হয় না, যেমন ইতালিতে রাজা ঘোড়া ও ঘোড়সওয়ার, ডোনা বা রানি এবং অন্য তাসগুলোকে সৈনিক হিসেবে কল্পনা করে তাস খেলার প্রচলন হয়,  পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঘোড়সওয়ারের সঙ্গে শিকারী। যারা রাজহাঁস বা হরিণ শিকার করে ইতালিতে তাসের সংখ্যা বায়ান্নই রেখে রাজহাঁস বা হরিণের ছবি সংবলিত তাসও বায়ান্ন তাসের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়।

  • তাস খেলার ইতিহাস- ( দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: