1. sjranabd1@gmail.com : S Jewel : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
আফিম যুদ্ধ: চিনাদের এক লজ্জার ইতিহাস - কালাক্ষর
বুধবার, ২৪ নভেম্বর ২০২১, ০৮:২৬ অপরাহ্ন

আফিম যুদ্ধ: চিনাদের এক লজ্জার ইতিহাস

  • Update Time : সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
আফিম যুদ্ধ
আফিম যুদ্ধ। ইমেজ সোর্স - Wikipedia

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আফিম চিনের উল্লেখ যোগ্য পন্য হিসেবে সব সময় ই ছিল । আর তাই এই আফিমের ব্যবসা ও ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই নির্দিধায় বলা যায়- আফিমের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল তা পুরো চীনের সামগ্রীক গতি ধারা ব্যাপক পরিবর্তন করে সাধন করেছিল যা চীনের জন্য একটি দুর্বিসহ অধ্যায় হয়ে দারিয়েছিল । যে চীনা সাম্রাজ্যে কোন বিদেশী প্রবেশ করতে হলে চীনা সম্রাটকে নজরানা দিয়ে প্রবেশ করতে হত সেই চীনে আফিমের যুদ্ধের পরবর্তী যুগে বিদেশী শক্তিবর্গ পুরো চীন সাম্রাজ্যকে অর্ধ উপনিবেশে পরিনত করে। চীন হয়েছিল পশ্চিমাদের সাম্রাজ্যবাদের খোরাক। একে একে বৃটেন, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং সর্বশেষ রাশিয়াও চীনকে ধরাশায়ী করেতোলে-সে সময় চীনা সম্রাট চিয়া চিং পালিয়ে বাঁচে এবং তার ছোট ভাই বিদেশীদের সাথে মহা অসম চুক্তি করে একপ্রকার দেশকে বিদেশের হাতে তুলে দিয়ে নিজ দেশে পরাধীন থাকার মত বেঁচে থাকে। নিচে আফিম, আফিমের ব্যবসা, আফিমের যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী চুক্তি ব্যবস্থা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

আফিম কি?

আফিম আসলে এক প্রকার ড্রাগ জাতীয় পণ্য। আফিম যদিও মূলত জাতীয় নেশা পন্য হিসাবে ব্যাবহার হয় কিন্তু এর বাইরে বিভিন্ন রোগের ঔষধ তৈরির কাজেও আফিম ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তার পরিমান এত কম যে একে মাদক ব্দব্য বলাই বেশি যুক্তি সংগত মনে করেন সবাই। আফিম অধিক মাত্রায় ব্যবহার করলে মানুষের সাময়িক মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে । আফিম দীর্ঘ দিন ব্যাবহার করলে এর পার্শ- প্রতিক্রিয়ায় মানুষের ভিতরের জীবনী শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে মানুষ একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু অবাক ব্যাপার হল,আফিম শুধু চীনের মানুষকেই নিঃশেষ করেনি বরং পুরো চীন সাম্রাজ্যকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল এই আফিম।

আফিম যুদ্ধ

আফিমের জমি। ছবি – সংগ্রহিত

চীনে আফিমের ব্যবহারের ঐতিহাসিক পোস্ট মর্টেম 

সর্বপ্রথম সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর দিকের প্রথম ভাগে আরব এবং তুর্কী অঞ্চল থেকে চীন দেশে আফিম আমদানি করা হত । সে সময় চীনের মানুষ এটাকে বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করত। মাদক হিসাবে এর ব্যাবহার করা যায় তা সে সময় চিনের মানুষের ধারনার বাইরে ছিল- পরবর্তীতে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারত তথা বাংলাদেশ অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমানে মাদক চীনে চোরা চালান হত। অলস আর আরাম প্রিয় চীনারা আফিমকে নেশা জাতীয় দ্রব্য হিসেবে খুব ভালভাবে গ্রহণ করেছিল। সে সময় নেশা জাতীয় পণ্য হিসেবে শুধু মাত্র অভিযাত ও আরামপ্রিয় লোকজন এটাকে গ্রহণ করে। চীনা সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আফিমের চোরা চালানী বন্ধ করার চেষ্টা করলেও তা বন্ধ তো হয়নি বরং বিভিন্নভাবে বিদেশী কোম্পানি গুলো আফিমের চোরা চালান বৃদ্ধি করেছিল।

আমার পুর্বের  লেখা  গুলো পড়তে নিচের লিংক গুলোতে ক্লিক করুন 

বিষয় টি শুধুমাত্র আরামপ্রিয় ও অভিযাত লোকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলনা। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আফিমের চোরাচালান মারাত্মক হারে বেড়ে গিয়েছিল। যা একটি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে সাম্যক ধারণা লাভ করা যায়।পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৮০০ খৃষ্টাব্দে চীনে আমদানীকৃত আফিমের পরিমান ছিল ২,০০০ পেটি, ১৯২০ সালে এই পরিমান বেড়ে গিয়ে দাড়ায় ১০,০০০ পেটি, ১৮৩০ সালে ২০,১০০ পেটি এবং যুদ্ধ পূর্ববর্তী ১৮৩৮ সালে তার পরিমান দাড়িয়েছিল ৪০,৯০০ পেটিতে। এক একটি পেটিতে ১৩৯ থেকে ১৬০ পাউন্ড আফিম থাকতো। 

চিনের কোয়াং টুং এবং ফুকিয়েন প্রদেশে এর বিস্তার সব চেয়ে বেশি হয়েছিল – এই দুই প্রদেশের প্রায় প্রতি ১০ জনের ৯ জন লোকই এই আফিমের নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সমাজের উচু থেকে করে নিচু শ্রেনীর – শাসক থেকে জন গন প্রায় সব সেক্টরের লোক জন ই এই বাজে নেশায় অভ্যাস্ত হয়ে পড়ে – এক জন সাধারণ নেশাখোর মজুর শ্রেণীর লোক দিনে .১০ থেকে .২০ টেইল খরচ করত শুধু মাত্র আফিমের নেশার পিছনে। আবার কেউ কেউ এর দ্বিগুন পরিমান অর্থ খরচ করত যাস্ট এই আফিম ক্রয়ের জন্য। এক চীনা পরিসংখ্যানে দেখা যায়- ১৮২৩ থেকে ১৮৩২ সালের মধ্যে চীনে গড়ে প্রতিবছর ১৮-২০ মিলিয়ন টেইল ব্যয় হত আফিমের পিছনে। ১৮৩৩ থেকে ১৮৩৪ সালের মধ্যে সে মাত্রা বেড়ে গিয়ে দাড়ায় ২৫ মিলিয়ন টেইলে। যা ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ সালের মাধ্যে চরমভাবে বেড়ে গিয়ে দাড়ায় ৪০ মিলিয়ন টেইলে।

আফিমের ব্যবসা শুরু এবং তার ধারাবাহিকতা

পশ্চিমা সম্রজ্য বাদি দেশগুলো শুরু থেকেই চাচ্ছিল যেকোন ভাবে চীন দেশে বাণিজ্য করতে। কিন্তু চীনের কঠিন রুদ্ধদ্বার নীতির কারণে পশ্চিমাদেশগুলো সুযোগ পাচ্ছিল না চিনে তাদের ব্যবসার খুটি পোক্ত করতে। রাজিকীয় কঠিন আইন ছড়াও চিনে পশ্চিমাদের ব্যাবসার পসর সাজাতে আরো একটি বাধা ছিল তা হল চীনারা তাদের নিত্য প্রয়োজনের সবকিছুই নিজেরাই উৎপন্ন করতো । যেকারণে বৈদেশিক বাণিজ্য তাদের তেমন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী দেশ বৃটেইন সহ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, পর্তুগাল ইত্যাদি দেশগুলো চেয়েছিল চীনের সাথে বাণিজ্য করতে। কারণ চীনের কাঁচামাল নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো বেশি লাভাবান হচ্ছিল। শুধু তাই নয় পশ্চিমাদের আরেকটি মূল উদ্দেশ্য ছিল চীনের বন্দরগুলো ব্যবহার করা।

চীনা আইন অনুযায়ি চিনা সম্রাট দের সাথে কেউ দেখা করতে বা কোন চুক্তি করতে গেলে সে দেশেরই কর্মকর্তা হোক আর বাইরের দেশের বনিয়া কিংবা রাজ প্রতিনিধী ই হোক, তাকে অবশ্যই চীনের প্রচলিত প্রথা তথা যা কাউটাউ প্রথা নামে পরিচিত তা মেনে অর্থাৎ হাটু গেড়ে চিনা রাজাকে কুর্ণিশ করে নজরানা দিয়ে দেখা করতে হয়। এতসব অপমান মেনে নিয়েও বনিয়া ইংরেজ রা চীনের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিল। উল্লেখ্য যে, ব্রিটেন থেকে ১৭ বার কর্মকর্তারা সম্রাটের সাথে দেখা করতে গিয়ে ১৬ বারই তাদের এই প্রথা মেনে নিতে হয়। কারন লাভে লোহা বয়- আর চিনের মত এত বড় বাজার ধরতে তারা এইটুকু অপমান গায়ে লাগায় নি –

ইংরেজ রা প্রথমে চিন রাজের বিভিন্ন শর্ত মেনে নিয়ে চীনে বাণিজ্য করার সুযোগ পায়। তারা এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক পরিমাণ আফিম গোপনে চোরা চালান করতে শুরু করে। আর এতে তারা প্রচুর লাভ করতে শুরু করে-এর ধারাবাহিকতায় ইংরেজরা জোচ্চুরী আর প্রতারণার মাধ্যমে অধিকার করা ভারত বর্ষে একচেটিয়া আফিমের চাষ শুরু করে । যদিও চীন রাজ এই অনাহেতু আপদ আফিমের চোরা চালান বন্ধ করার সাধ্য মত চেষ্টা করে কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা পুরোটাই ব্যর্থতায় পরিগনিত হয় জন গনের ভিতর আফিম খোরের সংখ্যাধিক্কের কারনে –

চীনে আফিমের প্রভাব

আফিম কারণে চীনের সমাজ ব্যাবস্থায় যে কুপ্রভাব দেখা দিয়েছিল তা হলো- চীনে আমেরিকান এবং ব্রিটিশ বণিকগণ আফিমের চোরাই চালান শুরু করেছিল মূলত ১৭৮০ সালের দিকে প্রথম দিকে চীনারা যখন চা, রেশম, চীনা মাটির বাসন ও অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর বিনময়ে বিদেশী বণিকদের নিকট থেকে আফিম ক্রয় করতে শুরু করে। প্রথমের দিকে সল্প পরিমানে হলেও অল্প কিছু দিনের মধ্যেই চীনে আফিমের চাহিদা এত অধিকহারে বেড়ে যায় যে, তখন তাদের আর চিনাদের উৎপাদিত পণ্য দিয়ে আফিমের দাম পরিশোধ করা সম্ভবপর হচ্ছিল না। চিনারা তখন রৌপ্য মুদ্রা দিয়ে আফিম ক্রয় করতে শুরু করে। এতে চীনা রৌপ্যের ভাণ্ডারের অনেক অংশ বিদেশে চলে যেতে থাকে। ফলে চীনে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার আশংকায় চলে আসে।চীনা জনগণের আফিমের প্রতি নেশা এত বেশি হারে তৈরি হয়েছিল যে, বিশেষ করে যুব সমাজ একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক আমাদের দেশে ইয়াবা নামক মাদক যে হারে আমাদের যুব সমাজ কে গ্রাস করছে তেমনি প্রায়, আর এই সুযোগের মাধ্যমেই বিদেশী বণিকরা চীনে প্রবেশ ও স্থান করে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছিল ক্রমান্নয়ে। এবং তা এতটাই দ্রুত ভাবে হচ্ছিল যে, তা চীনা সরকারের নিয়ন্ত্রেনের বাইরে চলে যাবার উপক্রম হয় ।

আফিম ব্যবসা প্রতিরোধে মাঞ্চু সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ গুলো

চিনের মাঞ্চুরিয়া প্রদেশের জন সাধারনের ভিতর আফিমের মারাত্মক বিস্তার এবং এর কুফল বুঝতে পেরে ১৮০০ সালের দিকে চীনের সম্রাট চিয়া চিং চীন দেশের অভ্যান্তরে আফিমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু ততদিনে যা হবার হয়ে গেছে দেখা যায় বহু চীনা নাগরিক এই আফিমের নেশায় মারাত্মক ভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই আফিমের ব্যবসা করে প্রচুর লাভবান হয়ে গেছে। যার মধ্যে কিছু রাজকর্মচারীও জড়িত ছিল বলে জানা যায়। সুতরাং তারা এত অর্থের লোভ ছাড়তে না পেরে চিনা রাজের আদেশ অমান্য করে উৎকোচের মাধ্যমে আফিমের চোরাইচালান ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। যার ফলে সরকারের করা আইন শুধু আইনই থেকে গেল। বাস্তবে এর কোন ফল হলো না। আফিমের চোরা চালান বন্ধের জন্য চিনা রাজের নেওয়া প্রথম পদক্ষেপ কোন যখন কোন কাজে আসল না । আবার অর্থনৈতিক সংকট যখন চরমে উঠে যাতে দেশের জনগনের জীবন যাত্রার মান যাতে নীচে নেমে না আসে সে জন্য চিনা রাজ এক প্রকারে বাধ্য হয়ে ভূ-স্বামীগণ ভূমি করের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। এর ফল হয় আরো ভয়াবহ কারন এর ফলে চিনে তখন বেশি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়।

এমন পরিস্থিতিতে মাঞ্চু সরকার আফিমের চোরাই চালান বন্ধের জন্য চুড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় খুজে পেলেন না। এর ধারাবাহিকতায় মাঞ্চু সম্রাট চিয়া চিং ক্যান্টন বন্দরে তার দেশের একজন যোগ্য ও দেশ প্রেমিক কর্মকর্তা লিন সে সু কে নিয়োগ দেন। লিন সে সু দায়িত্ব গ্রহনের পর দ্রুত গতিতে এই আফিম ব্যবসা বন্ধ করার জন্য কঠোর আইন তৈরি করেন। সেই আইনগুলি হলো-

  • 1.      বিদেশী কোন যুদ্ধজাহাজ চীনে প্রবেশ করতে পারবে না।
  • 2.      বিদেশী ফ্যাক্টরিগুলির অভ্যান্তরে কোন বন্দুক বা অস্ত্রসস্ত্র রাখা চলবে না।
  • 3.      বিদেশীদের সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চীনে রেজিষ্ট্রি করাতে হবে।
  • 4.      প্রতিটি বিদেশী ফ্যাক্টরিতে চীনা ভৃত্যের সংখ্যা নির্দিস্ট করে বেধে দেওয়া হবে।

তা সত্ত্বেও আফিমের বেআইনি ব্যবসা যখন বন্ধ কর গেল না। তখন ১৮৩৯ সালে ১০ ই মার্চ ৫৪ বছর বয়সী লিন-সে-সু ক্যান্টন শহরের যে অঞ্চলে গুলোতে বিদেশী বাণিজ্য সংস্থাগুলো গড়ে উঠেছিল সেই সব অঞ্চল তিনি অবরোধ করেন। প্রথমে তিনি বণিকদের নিকট রক্ষিত সকল বেআইনী আফিম ছিল তা তিনি তাঁর হেফাজতে সমার্পন করার নির্দেশ দেন। এর ধারাবাহিকতায় বিদেশী বণিকেরা পরিস্থিতির চাপে পড়ে প্রায় ২০,০০০ পেটি আফিম লীনের কাছে জমা দিতে বাধ্য হয়। জব্দ করা সেই সব আফিম ১৮৩৯ সালে ২ জুন লিন-সে-সু জন সমক্ষে লবন ও চুন দিয়ে ধ্বংস করে দেন। যার বিনিময় মূল্য ছিল তখন কার প্রায় ৬ মিলিয়ন টেইল। আর এটি ছিল আফিম যুদ্ধের প্রধান কারণ। 

আফিম যুদ্ধ

আফিম যুদ্ধ। ছবি – উকিপিডিয়া

আফিম যুদ্ধ

চীনে আফিম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে যে ইঙ্গ চায়না যুদ্ধ সংগঠিত হয় তাকেই আফিমের যুদ্ধ বলে। আর এ যুদ্ধ চীনাদের কাছে আফিমের যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত হলেও পশ্চিমা সম্রাজ্যবাদী বণিকদের কাছে এ যুদ্ধ ছিল স্রেফ বাণিজ্য যুদ্ধ। বর্তমান কালে ডোলান্ট ট্রাম যে বাণিজ্য যুদ্ধ এর ডাক দেয় বিষয় টা সেরকম ই ছিল অর্থাৎ এই আফিম যুদ্ধ দুই পক্ষের নিকট ভিন্নভাবে পরিচিতি পেয়েছে।

কোন ঐতিহাসিক এই যুদ্ধের কারণ হিসেবে শুধু মাত্র আফিম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধ এককভাবে দায়ি না করে বরং এর পিছনে আরো অনেক কিছু কারণের অনুঘটোক। যেমন তারা মনে করে যে, চীনের তথাকথিত নজরানা প্রথা, ক্যান্টন প্রথা এবং কাউটাউ প্রথা এ যুদ্ধের পিছনে অন্যতম অনুঘটোক ।আবার কোন কোন ঐতিহাসিক গন এই সব কারণগুলোর কোন একটি কারণকে ও মূল কারণ হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ। বরং তারা এগুলোকে শুধু মাত্র ইংরেজ দের চিনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধাবার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার স্বীকার করেন। এবং মূল কারণ হিসেবে তারা ব্যাখ্যা করেন যে, বৃটেন তথা পশ্চিমা বিশ্বের মূল টার্গেট ছিল চিনে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। এই আগ্রাসনের জন্য তারা চিনের বিরুদ্ধে একটি অজুহাত খুঁজতেছিল।

আর আফিম ব্যবসা ছিল এরই একটি পূর্ব নির্ধারিত একটি ফাঁদ। যে কারণে চীনারা বার বার পদক্ষেপ নিয়েও এই আফিমের ব্যবসা বন্ধ করতে পারেনি। ইংরেজ রা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যবসা করতে এসে যে ভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে ক্ষমতা বিস্তারের ছড়ি হাতে ন্যায় – ঠিক তেমন ভাবেই তারা চিনে ক্ষমতা বিস্তারের সার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল – আর তাই কোন কারণ বা অজুহাত যেটাই হোক না কেন ১৮৪০ সালে এ্যাডমিরাল এলিয়টের নেতৃত্বে ইংরেজরা তাদের প্রচুর সৈন্য ও অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে চীনে আক্রমন করে। চীনারা এই আক্রমন প্রতিহত করে নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সর্বাত্বক চেষ্টা করে। আর এভাবে প্রথম ঈঙ্গ-চীন যুদ্ধ তথা প্রথম আফিমের যুদ্ধ সূচনা ঘটে। ঐতিহাসিক ইমানুয়েল সু বলেছেন, “এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে চীনারা তাদের দেশে বেআইনী আফিমের বিস্তারের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিল।” মূলত সে কারণেই ঐতিহাসিকরা এ যুদ্ধকে প্রথম আফিম যুদ্ধ হিসেবে নামকরণ করেছেন। যাইগে চীনারা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে অসীম সাহসের সঙ্গে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করলেও শেষ মেশ এলিয়টের নেতৃত্বাধীন বৃটিশ বাহিনীর যুদ্ধ কৌশল এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের কাছে পরাজিত হয়। এ যুদ্ধে প্রায় ২০,০০০ চীনা সৈন্য নিহত হলেও এবং মাত্র ৫০০ বৃটিশ সৈন্য নিহত হয়।

আফিম যুদ্ধের জন্য মূলত যে সকল কারণ দায়ি ছিল

  1. আফিম যুদ্ধের প্রথম এবং প্রধান কারণ বর্ণনা হলো বণিকদের বিশাল পরিমান আফিম চীনা কমিশনার কর্তৃক ধ্বংস যা বিদেশী বণিকদের নিকট নিতান্তই অপমান জনক।
  • 2. দ্বিতীয় কারণ ছিল ব্রিটিশ বিণিকদের হাতে একজন চীনা নাগরিক নিহত হয়। এ ক্ষেত্রে কমিশনার এলিয়ট (বৃটেনের) ন্যায় বিচার না করে প্রহসনমূলক বিচার করলে বৃটেনের কমিশনার ক্ষেপে যায়।

কোন ঐতিহাসিক এই যুদ্ধের কারণ হিসেবে আফিম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধ এককভাবে দায়ি না করে বরং এর পিছনে আরো কিছু কারণের অনুঘটোক। যেমন তারা মনে করে যে, চীনের তথাকথিত নজরানা প্রথা, ক্যান্টন প্রথা এবং কাউটাউ প্রথা এ যুদ্ধের পিছনে অন্যতম অনুঘটোক ।আবার কোন কোন ঐতিহাসিক গন এই সব কারণগুলোর কোন একটি কারণকে ও মূল কারণ হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ। বরং তারা এগুলোকে শুধু মাত্র ইংরেজ দের চিনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধাবার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার স্বীকার করেন। এবং মূল কারণ হিসেবে তারা ব্যাখ্যা করেন যে, বৃটেন তথা পশ্চিমা বিশ্বের মূল টার্গেট ছিল চিনে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। এই আগ্রাসনের জন্য তারা চিনের বিরুদ্ধে একটি অজুহাত খুঁজতেছিল। আর আফিম ব্যবসা ছিল এরই একটি পূর্ব নির্ধারিত একটি ফাঁদ। যে কারণে চীনারা বার বার পদক্ষেপ নিয়েও এই আফিমের ব্যবসা বন্ধ করতে পারেনি। ইংরেজ রা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যবসা করতে এসে যে ভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে ক্ষমতা বিস্তারের ছড়ি হাতে ন্যায় –

আফিম

আফিম যুদ্ধ। ইমেজ সোর্স – BBC

ঠিক তেমন ভাবেই তারা চিনে ক্ষমতা বিস্তারের সার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল – কারণ বা অজুহাত যেটাই হোক না কেন ১৮৪০ সালে এ্যাডমিরাল এলিয়টের নেতৃত্বে ইংরেজরা প্রচুর সৈন্য ও অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে চীনে আক্রমন করে বসেন। চীনারা এই আক্রমন প্রতিহত করে নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর হয়। এভাবে প্রথম ঈঙ্গ-চীন যুদ্ধ তথা প্রথম আফিমের যুদ্ধ সূচনা ঘটে। ইমানুয়েল সু বলেছেন, “এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে চীনারা বেআইনী আফিমের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিল।” মূলত সে কারণেই ঐতিহাসিকরা এ যুদ্ধকে প্রথম আফিম যুদ্ধ হিসেবে নামকরণ করেছেন। যাইহোক চীনারা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অসীম সাহসের সঙ্গে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করলেও এলিয়টের নেতৃত্বাধীন বৃটিশ বাহিনীর যুদ্ধ কৌশল এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের নিকট পরাজিত হয় চীনা বাহিনী। এ যুদ্ধে প্রায় ২০,০০০ চীনা সৈন্য এবং মাত্র ৫০০ বৃটিশ সৈন্য নিহত হয়।

আফিম যুদ্ধ অবসান হয় যেভাবে

যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চীনা সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য চীনা সম্রাট চিয়া চিং দ্রুত ইংরেজদের সাথে দ্রুত শান্তি চুক্তি স্থাপনে ব্যগ্র হন। প্রথমেই দেশপ্রেমিক লিন সে সুকে পদচ্যুত করে নির্বাসিত করা হয় এই অপরাধে যে তার হঠকারী পদক্ষেপ এই ভয়ংকর যুদ্ধের জন্য দায়ি। অতঃপর চীনা সামন্ততান্ত্রিক রাজ সরকার ইংরেজ দের দেওয়া কতকগুলো অপমানজনক শর্ত মেনে নিয়ে বৃটিশদের সাথে একটি চুরান্ত রকমের অসম চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। যে চুক্তিটি আমরা নানকিং চুক্তি নামে জানি। ১৮৪২ সালের ২৯ আগস্টে নানকিংয়ের চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইঙ্গ চিন এর প্রথম আফিমের যুদ্ধের আবসান হয়।

নানকিং সন্ধি

যুদ্ধে জয়ী ইংরেজরা চীনের নিকট থেকে মোট ২১ মিলিয়ন রৌপ্য ডলার ক্ষতিপূরণ হিসাবে লাভ করে। আর এই ২১ মিলিয়নের মধ্যে যুদ্ধের জন্য সামরিক ক্ষতিপূরণ ১২ হিসাবে মিলিয়ন রৌপ্য ডলার, লিন কর্তৃক বিনষ্ট আফিমের ক্ষতিপুরন মূল্য ছিল ৬ মিলিয়ন রৌপ্য ডলার এবং ক্যান্টনে হং বণিকদের কাছে যে বকেয়া ঋণ শোধের জন্য দিতে হয়েছিল ৩ রৌপ্য ডলার। এর ফলে ক্যান্টনে কো-হং এর একচেটিয়া বাণিজ্যিক আধিপত্যের অবসান ঘটে।

ক্যান্টন, অ্যাময়, ফু-চাও নিংপো, সাংহাই- এই পাঁচটি চিনা বন্দর ইংরেজদের কাছে উম্মুক্ত করে দেওয়া হয়। চুক্তিতে বলা হয়, ব্রিটিশ কনসাল, বণিকেরা এবং তাদের পরিবারবর্গ এই অঞ্চলগুলিতে ইচ্ছা মাফিক বসবাস করতে পারবে। হংকং কে ইংরেজদের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়। দুই তরফের মধ্যে সরকারী চিঠিপত্রের ব্যাপারে সমতা স্বীকৃত হয়। বলা হয় বিদেশী পণ্যের উপর নির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক ধার্য করা হবে এবং অল্প কিছু দিনের মধ্যেই এই পরিমাণ নির্ধারিত হবে।

যুদ্ধ পরবর্তী বিদেশী প্রভাবগুলো কি ছিল এবং তার ফলে কি হলঃ—

  • বোগের সন্ধি চুক্তিঃ—
    ১৯৪৩ সালের ১৮ অক্টোবর নানকিং সন্ধি চুক্তির সম্পূরক আরো একটি সন্ধি চুক্তি চীন ও বৃটেনের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধি চুক্তিটিকে বোগের সন্ধি চুক্তি নামে অভিহিত করা হয়। এই সন্ধির শর্তসমূহ-
    ১. চিনের আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের উপর ৪ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হবে। চিনের রপ্তানিকৃত পণ্যের নির্ধারিত শুল্কের পরিমান হবে ১.৫০ শতাংশ থেকে ১০.৭৫ শতাংশ।
    ২. ব্রিটিশরা চীনে “অতি আঞ্চলিক অধিকার” লাভ করে বসে। অর্থাৎ ব্রিটিশ কনসালরা চীনে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের বিচার করতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় –
    ৩. ইংল্যান্ডকে চীনে সর্বাপেক্ষা অনুগৃহীত দেশের মর্যাদায় স্থান দেওয়া হয় । বোগের সন্ধি চুক্তিকে হুমেনের সন্ধি চুক্তি বলেও অভিহিত করা হয়।

ওয়াংশিয়ার সন্ধি চুক্তিঃ—
নানকিং চুক্তির পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বণিকেরা চীনে কিছু সুযোগ সুবিধা আদায় করার জন্য বেশ উৎসাহী হয়ে উঠে। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৪৩ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার কালেব কাশিং নামে তাদের বৈদেশিক দপ্তরের এক পদস্থ কর্মচারীকে চীন দেশে পাঠায়। কালেব কাশিং এর সাথে আরও একজন সঙ্গি ছিলেন। তারা মাঞ্চু সরকারের কাছে এই বলে আর্জি রাখে যে, বৃটেনকে চীন যে সুযোগ সুবিধা দিয়েছে আমেরিকাকেও সে সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। না হলে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৪৪ সালের মে মাসে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে আমেরিকান যুদ্ধ জাহাজ চীন অভিমুখে আসতে থাকে। ভিতু সন্ত্রস্থ চীনা সরকার আমেরিকার সাথেও ব্রিটেনের ন্যায় একটি অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। ১৮৪৪ সালের জুলাই মাসে সংগঠিত হওয়া চীন ও আমেরিকার মধ্যকার এ চুক্তিকে ওয়াংশিয়া চুক্তি বলা হয়।

সন্ধির শর্তবলীঃ

চীনে বসবাসকারী কোন মার্কিন নাগরিক যদি কোন চীনার সাথে কোন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে,চিনা আদালত নয় তার বিচার করবেন এক জন আমরিকান কনসাল। একজন আমরিকান অপরাধীর বিচার করার এক্তিয়ার কোন ভাবেই চীনা আদালতের থাকবে না।আমদানিকৃত বা রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর শুল্ক ধার্য করার সময় অথবা এই শুল্কের হার পরিবর্তন করা হয় সেই সময় চীনা সরকারকে আমরিকান কনসালের সাথে পরামর্শ করে নিতে হবে। অর্থাৎ শুল্ক ধার্য করার স্বাধিকার চীন সরকার চীন সরকার হারাতে বাধ্য হল।বিদেশী বাণিজ্য-জাহাজ যখন তখন ইচ্ছা মাফিক চীনের অভ্যান্তরে প্রবেশ করতে পারবে এবং তা সরকারের অনুমতি ছাড়াই চীন ছাড়তে পারবে। তাছাড়া আমরিকানরা পাঁচটি উম্মুক্ত বন্দরে তাদের ধর্মীয় গির্জা বানাবার অধিকার লাভ করে। বার বছর পর এই সন্ধির চুক্তি পুনর্বিন্যাস করা হবে বলে উল্লেখ করা হয় ।

হোয়াম্পেয়ার সন্ধিঃ—
একইভাবে ব্রিটিশরা নানকিং সন্ধির মাধ্যমে এবং আমেরিকানরা ওয়াংশিয়া সন্ধির মাধ্যমে যে সুযোগ সুবিধা লাভ করে ফরাসীরাও হোয়াম্পেয়ার সন্ধির মাধ্যমে একই সুযোগ সুবিধা আদায় করে ছাড়ে। বরং তারা আরও কিছু অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা লাভ করে। যেমন চীনের পাঁচটি বন্দরে পাঁচটি ক্যাথলিক গির্জা তৈরির অনুমতি লাভ করে।

পরিশেষে যুদ্ধের চুড়ান্ত ফলাফল হিসেবে আমি বলতে পারি যে চীনা চিং সরকার প্রথম আফিম যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে তারা কতকগুলো অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হল।তদুপুরি চীনে আফিমের ব্যবসাতো বন্ধ হলোই না বরং তা আরও ব্যাপক হারে বেড়ে গেল। অসম চুক্তির মাধ্যমে চীন তার নিজস্বতা হারাল, কাউটাউ প্রথা বিলুপ্ত হল, নজরানা প্রথা বিলুপ্ত হল। শুধু তাই নয় এখন চীনকেই উল্টো বিদেশী শক্তিগুলোকে সম্মান দিতে হচ্ছে। সর্বোপরি তার চুড়ান্ত ফলাফল হল দ্বিতীয় আফিমের যুদ্ধ।

Sorce: 

  •   wikipedia/1st_Opium_War
  •    https://en.wikipedia.org/wiki/Treaty_of_Nanking
  • https://en.wikipedia.org/wiki/Second_Opium_War

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!