Site icon কালাক্ষর

পরিশ্রম ই সাফল্যের মূল মন্ত্র-কথাটি অর্ধেক মিথ্যা অর্ধেক সত্য

পিটার প্যান সিন্ডোম

মডেল - অভিনেত্রী - বাধন। ছবি - কালাক্ষর ডেক্স

সোলায়মান জুয়েল :- আজ আমরা অসাধারন এক টপিক এর পোস্ট মর্টেম করবো- আচ্ছা আপনার মনে কি কখনো নিজেকে সম্পদ শালী রুপে দেখার ভাবনার উদয় হয় নি? আমি কিভাবে ধনী হবো ?

আচ্ছা মানুষ কিভাবে ধনী হয়? এই প্রশ্ন এর উত্তর যদি না হয় তবে ধরেই নিতে হবে আপনি হয় মহামানব নয়ত পাগল শ্রেনীর কেউ হবেন- কারন এই দুই শ্রেনীর মানুষের কোন কিছুর প্রতিই লোভ কাজ করে না- আচ্ছা ঠিক আছে বাদ দিলাম এই সব- একটা প্রশ্নের সোজা সাপ্টা উত্তর দেবেন? ধরুন আপনার কোন বন্ধু কিংবা পুর্ব পরিচিত কেউ হুট করেই ধনী হয়ে গেল- তখন আপনার মনে তাকে কিনে কি ধারনা আসবে? আমার ধারনা – সমাজের বেশিরভাগ মানুষের মত আপনার মনেও বদ্ধমূল ধারনা আসবে – যে হুট করে ধনী হয়ে যাওয়া লোকটি নিশ্চয়ই কোনো দুই নম্বরি উপায় ধনী হয়েছে। সোজা পথে ধনী হওয়া যায় না। এমন একটা মতবাদ সমাজে বহুল পরিচিত।

কিন্তু বাস্তবে আপনার সমাজে আপনার চার পাশেই হয়ত কিছু পন্ডিত ব্যাক্তি আছে – যারা মানুষ কে প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজনে জ্ঞ্যান দিয়ে বেড়ান – পরিশ্রম করলে ধনী হওয়া যায় – এই কথা টা হয়ত আপনাকেই তারা শ খানেক বার বলেছে- হয়ত আপনি নিজেও সেই ধারনা পোষন করেন – আমাদের আলচ্য বিষয় হল এইটাই –

ধনী হবার উপায় :-

পরিশ্রম করলেই ধনী হওয়া যায় না -যদি পরিশ্রম করলেই ধনী হওয়া যেত তাহলে বিশ্বের সবথেকে ধনী সম্প্রদায় হত আদিবাসী সমাজের মানুষেরা । আমাদের সমাজের লেবার শ্রেনীর মানুষেরা- যারা প্রচন্ড দৈহিক পরিশ্রম করে জীবন যাপন করে।

একজন সাঁওতাল কুলি মাটি কেটে ঝুড়ি দিয়ে বয়ে কি কষ্ট করে রোজগার করে সেটা নিশ্চয়ই আমরা সবাই দেখেছি। কিংবা এক জন কুলি – কিংবা রিক্সাওয়ালা – কিংবা দিন মজুর – তাদের পরিশ্রম করা আমরা রোজ দেখি – দিন রাত হাড় ভাংগা পরিশ্রম করে তারা কিন্তু দুঃখের বিষয় ওই বেচারাদের জীবন, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। এরা কলুর বলদের মত সারা জীবন খেটে মড়ে – কিন্তু কাংক্ষতি ধনী হওয়া তো দূর – বাসার এক মাসের খাবার জমিয়ে রাখতেই তারা পারে না-

ধনী হতে কি লাগে তা আজ একটা গল্প এর মাধ্যমে বোঝাবো -:

পরান আর জুরান নামের দুই বন্ধু ছিল- তারা এক মহল্লায় বাস করতো আর তারা একেবারেই সমবয়সী ছিল । শৈশব থেকে এক পাড়ায় মানুষ হয়েছে এবং এক সাথে বড় হয়েছে। দুই জন একই স্কুলে পড়েছে। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা একই। অদ্ভুত বিষয় এদের সংসারের গঠন ও একই – এক এদের সংসারে স্বামী স্ত্রী এবং পুত্র কন্যা। দুজনেরই পরিবারের সদস্যসংখ্যা চারজন। এরা আবার দুজনেই মাছের ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু ব্যবসা শুরুর কিছু দিনের মধ্যে একজন (পরান) ধনী হয়ে যায় আর অপরজন (জুরান) অত্যন্ত দরিদ্র ই থেকে যায় – কিন্তু কেন?

দরিদ্র মানুষটি দিনরাত পরিশ্রম করে কিন্তু কিছুতেই তার বন্ধুর মতন বড়লোক হতে পারে না- দরিদ্র প্রতিবেশী বন্ধু মানুষটির ধারণা হলো যে সর্বশক্তিমান তার সাথে অন্যায় রকমভাবে অবিচার করছে। সে তার পর্ব জন্মের কর্মফল পাচ্ছে- অপরদিকে তার ধনী বন্ধু কর্মফল এর জোরে ক্রমাগত ধনী থেকে আরো ধনী হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষোভ নিয়ে সে সারাদিন সর্বশক্তিমানের কাছে অভিযোগ জানায়। সর্বশক্তিমান কে ভৎসনা করতে পর্যন্ত পিছপা হয় না।

দরিদ্র মানুষটির ক্রমাগত অভিযোগ শুনতে শুনতে সর্বশক্তিমান অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন । একদিন তিনি দরিদ্র মানুষটির সামনে প্রকট হলের এবং তাকে বললেন যে, তোমার ক্রমাগত আমার ওপরে অভিযোগ করা কর- আমি তোমার এই অমুলক আর অপরিমাণ দর্ষি অভিযোগ আর সহ্য করতে পারছি না। তোমার অভিযোগ তোমার এই গরীবী হালের জন্য আমি দ্বায়ী আর তোমার বন্ধু কেন বড়লোক? এর পিছনেও আমার হাত আছে- তাই আমি তোমাদের দু’জনকেই আজ থেকে সমান করে দিলাম। তোমার ধনী বন্ধুটি ও আজ থেকে তোমার মতনই গরিব হয়ে যাবে। তোমাদের জিবিকা নির্বাহ করার জন্য আমি তোমাকে এবং তোমার বন্ধুকে একটি করে মাছ ধরার ছিপ দিচ্ছি । যা দিয়ে তোমরা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারো – তোমরা দুজনেই তোমাদের জীবন আজ থেকে আবার – শূন্য থেকে শুরু করো তোমাদের জীবন।

পরের দিন সকালে ওই দুই প্রতিবেশী একই অবস্থায় চলে গেলো অর্থাত্ ধনী মানুষটি হঠাৎ করে গরিব মানুষ সম হয়ে গেলেন একটা ছিপ ছাড়া তার কাছে সম্বল বলতে আর কিছুই রইল না।

হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে আমার অন্য লেখা গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংক গুলোতে ক্লিক করুনঃ

এবার দুই বন্ধু মিলে একসাথে ছিপ দুটিকে নিয়ে গেলেন একটা পুকুরে। দুজনেই পুকুরে ছিপ ফেলে বসে থাকল। সারাদিন পরিশ্রম করার পর দুজনেরই চারটে করে মাছ জুটলো। প্রথম বন্ধুঃ অর্থাৎ যে গরিব ছিল সে তো চারটে মাছ পেয়ে বেজায় খুশি। চারটে মাছ বাড়িতে নিয়ে গেল এবং সে গুলোকে ভাল করে ভেজে বাড়ির চারজন মজা করে খাবার খেলো। আর মনে মনে ভাবতে থাকলো এইবার কোথায় যাবি, এখন আমিও যা তুই ও তাই। 

দ্বিতীয় বন্ধু অর্থাৎ যে ধনী ছিল সে উপার্জিত চারটে মাছ নিয়ে বাজারে গেল। চারটে মাছের থেকে তিনটে মাসে বাজারে বিক্রি করে দিল। বিক্রি করার পর একটা মাছের টাকা দিয়ে সে একটা ছিপ কিনলো। আর বাকি দুটো মাছের টাকা দিয়ে সে একজন লোককে বায়না করল যে তার সাথে পরের দিন পুকুরে নতুন ছিপ টি নিয়ে মাছ ধরতে বসবে। বাকি রইল একটা মাছ। সেই মাছটা নিয়ে এসে বাড়ি এলো এবং তারা চারজনে অর্থাৎ সে তার স্ত্রী এবং তার পুত্র কন্যা সেই একখানা মাছ ভাগ করে আধপেটা খেয়ে রইল।

পরের দিন আবার দুই বন্ধু মিলে মাছ ধরতে গেল ওই একই পুকুরে। আজ প্রথম বন্ধুর কাছে আছে একটা ছিপ আর দ্বিতীয় বন্ধুর কাছে আছে দুটো ছিপ এবং একজন কর্মচারী। তারা মাছ ধরতে বসল। প্রত্যেক ছিপে আবার আগের দিনের মতো চারটে করে মাছ উঠলো। তাহলে হিসাব মত হল, প্রথম বন্ধুর কাছে চারটে মাছ আর দ্বিতীয় বন্ধুর কাছে আটটি মাছ।

প্রথম বন্ধু আবার চারটি মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল এবং চারজনে একটি একটি করে মাছ খেয়ে ফেলল। আজ প্রথম বন্ধুর মনটা ভালো নেই দ্বিতীয় বন্ধুটি কোথা থেকে আরেকটা ছিপ আর কর্মচারী পেল সেই নিয়ে এসে বেজায় চিন্তিত। তার ক্রমশ মনে হচ্ছে ভগবান নিশ্চয়ই আবার কোন ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন। দুশ্চিন্তায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে সে ঘুমিয়ে পরল।

দ্বিতীয় বন্ধু তার আটটি মাছ থেকে দুটো মাছ নিজের বাড়ির জন্য রেখে দিয়ে বাকি মাছগুলো বিক্রি করে দিল এবং আবার দুটো ছিপ এবং তিনজন কর্মচারী জোগাড় করে নিল পরের দিনের জন্য। দ্বিতীয় বন্ধুর বাড়িতে আজ একটু ভালো খাওয়া জুটলো। তারা চারজনে অর্ধেক অর্ধেক করে মাছ অন্তত খেতে পেল আজ।

আবার সূর্যোদয় হলো। আবার দুই প্রতিবেশী বন্ধু চলো পুকুরঘাটে মাছ ধরতে। আজ প্রথম বন্ধুর কাছে সেই একটাই ছিপ। দ্বিতীয় বন্ধুর কাছে চারটি ছিপ। এবং তাকে নিয়ে মোট চার জন কর্মচারী। আজ আবার তাদের প্রত্যেকটা ছিপে চারটে করে মাছ উঠলো। প্রথম বন্ধু পেলো চারটি মাছ। আর দ্বিতীয় বন্ধুর হলো 16 টি মাছ।

বাড়ি ফেরার পর আজ প্রথম বন্ধুর স্ত্রী প্রথম বন্ধুর ওপর খুবই রেগে গেল। সেই একঘেয়ে রোজ মাছ আর মাছ। এর বেশি কিছু করার মুরোদ কি তোমার নেই?

দ্বিতীয় বন্ধু বাড়ি ফেরার আগে বাজারে গেছিল বারোটি মাছ বিক্রি করে দিল, সাথে বিক্রি করে দিল ছিপ গুলো। একটা বড়ো মাছ ধরার জাল ভাড়া করল। ওই চারজন লোককে বলল, কাল খুব সকাল সকাল কাজে চলে আসতে। রোজ রোজ যখন কাজ তাদের সে দিচ্ছেই তখন এবার থেকে সাপ্তাহিক ভাবে তাদের মাইনে প্রদান করবে। স্থায়ী নির্ভরযোগ্য কাজ করার জন্য কর্মচারীরাও বেজায় খুশি হয় রাজি হয়ে গেল। ফলে কর্মচারীদের পয়সাটা সেদিনের মত ধার হিসেবে থেকলেও বেঁচে গেল। ওই টাকা দিয়ে পুকুরের মালিকের কাছ থেকে পুকুরটা একদিনের জন্য ইজারা নিয়ে নিল।

বাড়িতে ফিরে আজ তারা চারজন একটা একটা করে মাছ খেলে পেট ভরে। দ্বিতীয় বন্ধুর স্ত্রী আজ তার স্বামীর প্রতি খুব খুশি, দু দিন কষ্ট করার পর আজ তারা পেট ভরে খেতে পারছে। স্বামীর উপর তার গর্ব হল। রাতে স্বামীর বুকে মাথা রেখে সে স্বামীকে আত্মবিশ্বাস জোগালো, তুমি পারবে! আগের থেকেও অনেক ভালো জীবন যাপন আমরা করতে পারবো আগামীতে। আমাদের সময় শুরু হয়ে গেছে। পরেরদিন প্রথম বন্ধু ছিপ টা নিয়ে একাই মাছ ধরতে গেল। দ্বিতীয় বন্ধুকে সে আর দেখতে পেল না। প্রথম বন্ধু মনে মনে ভাবল, দ্বিতীয় বন্ধু হয়তো হতাশায় আক্রান্ত হয়ে ঘরে বসে রয়েছে। অত বড়লোক ছিল সে। অত বড় ব্যবসা ছিল তার। সেখান থেকে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার ব্যবসা কি তার পোষায়? প্রথম বন্ধু মনে মনে একটু খুশিও হলো। ভগবান ন্যায় বিচার করেছেন। আজ সে চারটে মাছ পাবে আর তার বন্ধু পাবে কাঁচকলা। সে মনে মনে এও ভাবলো যে তার পরিশ্রম তাকে একদিন ধনী করবেই। পরিশ্রমের বিকল্প কিছু নেই।

পুকুরে পৌঁছে প্রথম বন্ধু দ্বিতীয় বন্ধুর কর্মচারীর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলো। সে কর্মচারী তাকে বলল, আজ এ পুকুরে মাছ ধরা যাবেনা। তুমি অন্য কোথাও যাও হে। এ পুকুর আমার মালিক ইজারা নিয়েছে। আজ আমরা এখানে জাল ফেলবো। এই সমস্ত মাছ আমাদের। তুমি পাশের ওই ডোবায় গিয়ে মাছ ধরে। এ পুকুরে হবে না।

প্রথম বন্ধুঃ অসম্ভব প্রতিবাদ করল। কিন্তু তার ফল কিছু হলো না। কারণ, পুকুরের মালিক নিজে এসেও বলল যে, পুকুরটা আজ ইজারা দেওয়া হয়েছে, তার সাথে প্রতিদিন যে মাছ ধরত সেই লোকটাকে। সুতরাং যেদিন পুকুরটা ফাঁকা হবে সেদিন সে যেন তার ছিপ নিয়ে এই পুকুরে এসে যত ইচ্ছে মাছ ধরে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, পুকুর ফাঁকা আর কোনদিনই হলো না। দ্বিতীয় বন্ধু পুকুরটি পাকাপাকিভাবে ইজারা নিয়ে নিয়েছে। তার কর্মচারীরা নিয়মিত পুকুর থেকে মাছ তুলে নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করে তার মুনাফা মালিককে দিয়ে আসে। দ্বিতীয় বন্ধুর প্রথম কর্মচারী এখন ম্যানেজার। ম্যানেজার পুরো ব্যাপারটা দেখাশোনা করে। দ্বিতীয় বন্ধু নিজে এখন তার পুঁজি অন্যান্য ব্যাবসায়িক স্থানে খাটিয়ে আরো বেশি মুনাফা তোলার জন্য ব্যস্ত।গল্পটা এখানেই শেষ। কারণ, প্রথম বন্ধুর আর কোন খবর ইতিহাসের পাতায় নেই। ইতিহাস শুধু সফল মানুষদের নাম মনে রাখে।

মোরাল : এই গল্পটা পড়ে আপনার সময় অপচয় হবে, যদি আপনি এই গল্পটা নিজের মতন ভাবে নিজের জীবনে প্রতিফলিত না করেন। আমার কাজ লেখা। বুঝে নেওয়ার দায় আপনাদের।

 

Exit mobile version