1. sjranabd1@gmail.com : S Jewel : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি: জিততে গিয়ে জুয়ারিরা যে কারণে বার বার হেরে যায় - কালাক্ষর
শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৮:২৪ পূর্বাহ্ন

গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি: জিততে গিয়ে জুয়ারিরা যে কারণে বার বার হেরে যায়

  • Update Time : শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১
জুয়ারি
ক্যাসিনো

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশ ইতালির জনগণ ২০০৫ সালে এক অবিস্মরণীয় ‘মাস হিস্টেরিয়া’ বা ‘গণ উন্মাদনা’ প্রত্যক্ষ করেন। ইতালিতে লটারি কেনা থেকে সুত্রপাত হওয়া  কুখ্যাত এই ঘটনার নাম ‘ফিফটি থ্রি ফিভার’ নামে পরিচিত। ইতালির বিখ্যাত শহরের যেমন বারি, নেপলস, ভেনিস এর নামানুসারে মোট ১১টি হুইল ছিল এবং জুয়াতে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেককে প্রথমে একটি হুইল নির্বাচন করতে হত। তারপর নির্বাচিত হুইলের বিপরীতে জুয়ারিদের ১ থেকে ৯০ এর মধ্যবর্তী সংখ্যার যে কোনো একটির ওপর বাজি ধরতে হত।

ইতালীতে হওয়া এই জুয়া খেলার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করত একজন ব্যক্তি সূচনালগ্নে কত বাজি ধরেছেন,তিনি সর্বমোট কতটি সংখ্যা তিনি বেছে নিয়েছেন এবং তার পছন্দ করা সংখ্যাগুলোর কতগুলো সঠিক প্রমাণিত হয়েছে এসবের উপর।

কিন্তু ২০০৩ সালের কোনো এক সময়ে আচমকা ভেনিস নামাঙ্কিত হুইলে ৫৩ সংখ্যাটির প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। আর এই ৫৩ সংখ্যাটির ক্রমাগত অনুপিস্থিতি বাজিকরদের মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম হয়। জুয়ারিদের ভিতরের কমবেশি সকলেই ভাবতে শুরু করেন যে ভাগ্যদেবী বুঝি এবার তার দিকে প্রসন্ন হবেন। একটি নির্দিষ্ট হুইলে একটি সুনির্দিষ্ট সংখ্যার বিরামহীন অনুপস্থিতি থেকে তারা ধারণা করে নিলেন যে ৫৩ সংখ্যাটি অতি শীঘ্রই দেখা দেবে এবং এই আশাবাদী মনোভাবই জুয়ারিদের আরও অধিক পরিমানে বাজি ধরার প্রতি আকৃষ্ট করে।

তাস খেলার ইতিহাস নিয়ে আমার লেখা পুরাতন পোষ্ট দুটি পড়ার অনুরোধ রইল

এর ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে এসে ফিফটি থ্রি ফিভারের কারণে সহস্রাধিক মানুষ সর্বস্বহারা হয়ে পড়েন। জুয়াতে হেরে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোর মধ্যে অনেকেই শেষ অবধি গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন। পরিশেষে ৯ ফেব্রুয়ারি লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হলে ফলাফল আসে ১৮২ টি নো শো। আপনি কি জানেন? বাজিতে লাগানো লটারির সর্বমোট বাজির অংকটা কত ছিল? ৪ বিলিয়ন ইউরো! কি শুনেই মাথা ঘোরা শুরু করেছে তাই না? আমার নিজেরো হয়েছিল যখন প্রথম এই কথা শুনেছিলাম।

এখন প্রশ্ন এসে যায়,লটারি নিয়ে ইতালিয়ানদের এত উন্মাদনার কারণ কি?  যদি আপনার মনেও এমন প্রশ্ন এসে যায় তবে বলি প্রকৃতপক্ষে কেবল ইতালিয়ানরা নন বরং অধিকাংশ মানুষই এই জাতীয় উন্মাদনার শিকার হয়ে থাকেন যদি তারা বিশেষ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এই বিশেষ পরিস্থিতির নাম ‘গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি’। ‘গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি’ মূলত মানুষের চিরন্তন দক্ষতার এই সীমাবদ্ধতাকে বুঝানো হয়।

মানুষের মনে বর্তমানে ঘটমান প্যাটার্ন বা সিকোয়েন্সকে বাছ বিচার করে আসন্ন ঘটনাবলী অনুমান করতে চাওয়ার এই চর্চাকেই গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। ব্যাংক অফিসার, বেসবল আম্পায়ার, বিচারক, জুয়াড়ি, শেয়ার বিনিয়োগকারী এমনকি গোলকিপাররাও এই ফ্যালাসির শিকার হয়ে ভবিষ্যতের একটি ভ্রান্ত পূর্বাভাস করে থাকেন।

গ্যাম্বলারস ফ্যালাসিকে ‘মন্টে কার্লো ফ্যালাসি’, ‘নেগেটিভ রিসেন্সি ইফেক্ট’ বা ‘ফ্যালাসি অভ দ্যা ম্যাচিউরিটি অভ চান্সেস’ নামেও ডাকা হয়। চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এই ফ্যালাসি সম্পর্কিত কিছু মৌলিক ধারণা:

  • যে ঘটনা যতবার ঘটবে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনাও তত কমবে বিপরীত দিকে যে ঘটনা যত কম ঘটবে ভবিষ্যতে সেই ঘটনা ঘটবার সম্ভাবনা তত বাড়বে। সংখ্যানুপাতে যথেষ্ট বলিষ্ঠ ও দৃঢ় অথচ বাস্তবিক অর্থে একে বারে অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন এই বিশ্বাসই হল গ্যাম্বলারস ফ্যালাসি।
  • বস্তুবিক অর্থে কোন একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক ঘটনা হলেও কোন একটি ঘটনার পূর্বে সংঘটিত হওয়া বা না হওয়া ভবিষ্যতে এর পৌনঃপুনিকতাকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে না।
  • মানুষের বাস্তব জীবনে সম্ভাব্যতা বা পরিসংখ্যান কখনোই আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় না।
জুয়ারি

ক্রিকেটের দুই অধিনায়কের টস করার দৃশ্য । ছবি – dinbodolbd.com

ধরুন, আপনার হাতে একটি নিটোল অর্থাৎ খুঁতহীন মুদ্রা দিয়ে বলা হয় আপনি পরপর সাতবার মুদ্রাটি শুন্যে ছুড়েদেবেন। আপনি কথামত তাই করলেন, সাতবার নিক্ষেপের ফলাফল হল যথাক্রমে টেল, হেড,হেড,হেড,টেল, টেল টেল, হল । এবার যদি আপনাকে বলা হয়, আপনি যদি অষ্টম বার মুদ্রা নিক্ষেপ করেন তবে মুদ্রার কোন পিঠটি উঠবে? যেহেতু শেষ তিনবারের টানা তিনবারই টেল এসেছে, তাই শুধু আপনি নন বেশিরভাগ মানুষেরই মনেই পরবর্তীতে হেড ওঠার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে কেন না পরপর কয়েকবার টেল ওঠায় এর ঠিক পরবর্তী নিক্ষেপে হেড ওঠার মাধ্যমে বিষয়টিতে একটি সমতা বিধান হবে। পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্যতার বিচারে একটি নিটোল অর্থাৎ একেবারে নিখুঁত মুদ্রা নিক্ষেপ করলে তার হেড বা টেল দু’টো আসার সম্ভাবনাই সমান কারণ দু’টো ঘটনাই স্বাধীন। আপনি একটি মুদ্রাকে শুন্যে ছুড়ে দিলে হেড বা টেল যে কোনোটি আসার সম্ভাবনাই সমান। এর অর্থ এই যে আপনি টানা ৪০০০ বার একটি খুঁতহীন মুদ্রা নিক্ষেপ করে যদি প্রতিবারই টেল পান তবুও ৪০০১ তম বার নিক্ষেপে হেড আসার এতটুকু বেশি সম্ভাবনা থাকে না; সেবারও টেল ও হেড যে কোনো একটি পাওয়ার সম্ভাবনা একই থাকে। ঠিক এই কারণে গাণিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যাবে যে, ‘হেড, টেল, টেল, হেড’ এবং ‘হেড, হেড, হেড, হেড’ দু’টো ঘটনা মূলত একই।

এবার আপনাদের ব্যাখ্যা দেই,কেন এই ফ্যালাসিকে মন্টে কার্লো নামেও আখ্যা দেওয়া হয়? ১৯১৩ সালের ঘটনা, মোনাকোর রুলে টেবিলে টানা ২৬ বার কালো উঠে আসে। জুয়াটিতে জুয়ারিদের ভিতরে যারা ২৭ তম বারে লালের উপর বাজি ধরেছিল তারা জিতে গেলেও বেশির ভাগের প্রত্যাশা ছিল টানা এতবার কালো আসার পর এখন টানা কয়েক বার লাল এসে পুরো বিষয়টির ভারসাম্য রক্ষা করবে। আর এই ভাবনা থেকেই বেশির ভাগ জুয়ারী জিতে নেওয়া টাকার বিশাল অঙ্ক অনেকে সেখানেই খুইয়ে দ্যায়। গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসির প্রভাবে এই জাতীয় পক্ষপাতিত্বমূলক চিন্তাভাবনা দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে প্রতিনিত জুয়াড়িরা ক্যাসিনোতে সর্বহারা হচ্ছেন। ক্যাসিনোতে স্থাপন করা গোপন নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও থেকে গবেষকরা এমন তথ্যই পেয়েছেন

জুয়ারি

পেনাটি শুট আউটের ছবি – সোর্স – ব্রিং

গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসির স্বীকার হতে দেখা যায় ফুটবল খেলার গোল রক্ষক দের। বিশেষ করে যখন পেনাল্টি শুট আউটে কোন খেলার ভাগ্য নির্ধারিত হয় তখন, পর পর দুই বার গোল বারের ডান দিকে পেনাল্টির বল কিক করার পর গোল রক্ষক আগে থেকেই চিন্তা করে রাখেন এই বার গোল পোস্টের বাম দিকে কিক মারর চান্স বেশি তাই তিনি সেই দিকে ড্রাইভ মারার জন্য আগে থেকে প্লান করে রাখেন। আর এই ভাবনা থেকে গোল রক্ষক যে খেলোয়ার পেনাল্টি মারছে তার পায়ের দিকে মনোসংযোগ দিতে ব্যার্থ হয়।

গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসির সাথে শিক্ষা কিংবা আইকিউ’র এর এক অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, যারা অধিক শিক্ষিত বা উচ্চ আইকিউ স্কোরের অধিকারী তারা এই ফ্যালাসির সব চেয়ে বেশি শিকার হন। কারণ হিসেবে বলা যায়, এই মেধাবী মানুষ গুলো নিজেদের মেধা, চিন্তন দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে নিজেদের ব্যপারে তারা এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে থাকেন যে, এই সব লোক জন প্যাটার্ন বা সিকোয়েন্সের অনিবার্যতা সম্পর্কে নিজেদের গ্য্যান কে শতভাগ নির্ভুল ভাবেন। কিন্তু বিষয়টি তো কখনোই ষষ্ঠেন্দ্রিয় নির্ভর কোনো কিছু নয়। ফলে নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে অতি আত্মবিশ্বাস এই সকল লোক জন কে অনায়াসেই ভুল সিদ্ধান্তের দিকে প্ররোচিত করে। 

সৃজন শীল বাংলা ব্লগ কালাক্ষর এ আমার লেখা পুরাতন লেখা গুলো পড়ার জন্য অনুরোধ রইল 

জুয়ারীদের মত ‘গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি’ তে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ও ভুগতে দেখা যায়, ব্যাংক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও যখন ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তখন তারাও এই জাতীয় ভুল করে থাকেন। একজন কর্মকর্তার কাছে কোন ক্রমে ঋণ বিষয়ক দরখাস্তগুলো আসছে সেটি তার কাছে একটি গুরুত্ববহ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। পরপর দুই থেকে তিনজন আবেদনকারীকে ঋণ মঞ্জুর করার পর তারা পরবর্তী আবেদনটি নামঞ্জুর করবেন তার সম্ভাবনা থাকে প্রায় ৮০%। আবার এর বিপরীতটিও সম্ভব। অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে দুই তিনটি আবেদন নাকচ করে দেওয়ার পর তারা কিছুটা নিজেকেই অবচেতনে প্রবোধ দেওয়া শুরু করেন পরবর্তী ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়ার জন্য।   

আজকের লেখাটি শেষ করব অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় দিয়ে আর তা হল, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিচারকরা যারা শরনার্থীদের আশ্রয় সুবিধা দেওয়ার বিষয় টি দেখভাল করেন তাদের ক্ষেত্রেও ফ্যালাসির শিকার হতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে দেখা যায় তারা পর পর কয়েক জনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখালে পরের বার মন থেকে নেতিবাচক মোনোভাব দেখাবেন বলে মন থেকে ডিসিশন নিতে থাকেন, আর তা শরনার্থীদের করা আবেদন পত্র যাচাই বাছাই করার আগে থেকেই তারা এমন টা মন থেকে ভেবে রাখেন। ফলাফল দেখা যায় এক জন সব দিক থেকে যোগ্য হয়েও বাদ পরে যান যাস্ট বিচারকদের এই  ‘গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি’ তে ভোগার কারণে। তাই আমাদের সকলেরই প্রত্যাশা যে, কোনো দেশে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভাবেই আবেদনের ক্রম গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিৎ নয়। পরপর দু’জন শরনার্থীর আবেদন গৃহীত হলে তৃতীয়জনের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার সম্ভাবনা ৩৫.৫% কমে যায়। অথচ এই ফ্যালাসির বিষয়টিকে বাদ দিয়ে হিসেব করলে আশ্রয় সুবিধাদানের গড় হার দাঁড়ায় ৫৯%। পার্থক্যটা একেবারেই সুস্পষ্ট! সচেতন বা অবচেতন যেভাবেই হোক বিচারকদের এক অদ্ভুত পক্ষপাতদুষ্ট বিশ্বাস যে পরপর তিনটি আবেদনে ইতিবাচক সাড়া প্রদানে কোনোভাবেই সমতা চিত্রায়িত হয় না।

তাই আমাদের সকলের উচিৎ বাস্তব জীবনে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো আমাদের আমলে নেওয়া। তাহলে যে কোন ঘটনার ফলাফলের ইতিবাচকতা সামান্য হলেও বেশি পাব। 

It’s a bangle article describe the gambler’s fallacy. All the necessary references are hyperlinked within the article. 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!