Site icon কালাক্ষর

ফলস কজ ফ্যালাসিঃ কোন ঘটনার কারণ নির্ণয়ে আমরা যে ভুল করি

ফলস কজ ফ্যালাসি

মডেল - পরী মনি, ছবি - ফেসবুক

পৃথিবীতে বর্তমানের অতি উন্নত সভ্যতার বিকাশে কিসের ভূমিকা সর্বাধিক জানেন? মানুষের অতি কৌতূহলি স্বভাব। কোন ঘটনা কিংবা কোন কিছু সেইটা ভাল কিংবা খারাপ যাই হোক আমাদের মনে সর্ব প্রথম কি? কেন? কিভাবে? কোথায়? কে? কখন? এই সব প্রশ্ন আসে মনে- আর এইটা কেবল আজ নয় সভ্যতার প্রথম থেকেই আমরা যেকোনো ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে এসেছি। একটি ঘটনার ফলে আরেকটি ঘটনা ঘটছে, এরকম দুইটি ঘটনার মধ্যে ‘কজ অ্যান্ড ইফেক্ট (cause And Effect) সম্পর্ক স্থাপন করে দর্শনবিদ্যায় সেটাকে ‘কজ্যালিটি’ (causality) বলা হয়। মানবজাতি নিজেদের অতীত ও বর্তমান ব্যাখ্যা করার জন্যে এই কজ্যালিটির উপরে নির্ভর করে থাকে। অতীতের কোন ঘটনার সাথে বর্তমানের কোন ঘটনার যোগ সুত্র মিলিয়ে ভবিষ্যতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে, সেটাও কজ্যালিটির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়।

ফলস কজ ফ্যালাসির উদাহরণ 

উদাহরণ দেই – ধুরুন আপনি স্টুডেন্ড লাইফে ঠিক মত পড়া লেখা করেন নি। কোন মত টেনে টুনে পাশ করে জাতীয় বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। তাই আপনি এখন কোন অফিসে থার্ড ক্লাস কোন জব করেন, আপনার বেতন যা পান তা দিয়ে টেনে টুনে সংসার চলে আপনার শেষ বয়সে আপনার অবস্থা কেমন হবে তা কিন্তু চোখ বুজেই বের করা যায়। সাথে আপনার সন্তান যে কোন দিন ভাল কোন প্রাইভেট বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ানোর যোগ্যতা ও  আপনার হবে না, এটাও বোঝা জায়। তার মানে হল – আপনার স্টুডেন্ট লাইফের কর্ম কান্ড এর জন্য আপনার বর্তমান অবস্থা কি ? ইন ফিউচার কি হবে তা ই বের করার নাম হল কজ এন্ড ইফেক্ট এর কাজ। 

সৃজনশীল ব্লগ কালাক্ষর এ হিউম্যান সাইকোলজী নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী লেখাগুলো পড়ে ফেলার অনুরোধ করছি

মানবজাতির যুক্তিগত বিচারবুদ্ধি উন্নত হওয়ার সাথে সাথে কজ্যালিটির ধারণাও এসেছে আমুল পরিবর্তন। এক সময় মানুষ চোখে যা দেখতো তার সাথে তার অতীত কে মিলিয়ে ফিউচার এর ব্যাপারে সিদ্ধান্তে চলে আসতো। শুধু অতীত নয় বর্তমান কালেও কিছু মানুষের ভিতর এমন স্বভাব খুব প্রকট আকারে দেখা যায়। সিগারেট খেলে ক্যান্সার হয় আর ক্যান্সারের ফলে মৃত্যু হয়। ধরুন কারো ক্যান্সার হল তার মানে এই নয় সে সিগারেট খেয়েছে বলেই হয়েছে। ক্যান্সার অনেক কারনেই হয়। আধুনিক বিজ্ঞানে তা প্রমানিত। দেখা গেল যার ক্যান্সার হয়েছে সে কোন দিন সিগারেট খায় ই নি। কিন্তু এক শ্রেনীর মানুষ সেই লোক কে অতীত কিংবা বর্তমানে সিগারেট খাবার ফল হিসেবে দোষারোপ করে ফেলতে দেখা যায়। বিষয়টি আরো ভাল ভাবে বলতে গেলে বলা যায়, কোন মানুষের এইডস ধরা পরেছে। আপনি যখন এই ঘটনা শুনবেন তখন আপনার মনে হবে সে হয়ত নিষিদ্ধ কোন পল্লিতে গিয়েছিল কিংবা তার চরিত্র খারাপ। আপনার মনে এক বার ও আসবে ? যে তার ব্লাড রিলেটেড ডিলিংস এর কারনে এইডস হয়েছে, এমনো হতে পারে লোক টি সেলুনে গিয়েছিল নাপিত অন্যের ব্যাবহার করা ব্লেড দিয়ে তার সেভ কিংবা চুল কাটতে গিয়ে সেই ব্লেডের মাধ্যমে তার শরীরে এই আই ভি এর জীবানু আসতে পারে?

মডেল – জয়া আহসান। ছবি- ফেসবুক

 

কেন মানুষ এমন করে? এই প্রসঙ্গে যদি বলা হয়? তবে বলা যায়, যদিও বর্তমান কালে বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, পরিসংখ্যান ও সামাজিক বিজ্ঞানে এই প্রসংগে ব্যাপক তথ্য দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে গণিত ও দর্শনগত দিক থেকে ‘কজ্যালিটি’ চিন্তা করা কঠিন। কারণ, কোন বিষয়ে সুনির্দিস্ট রেজাল্ট খুজে বের করার জন্যে যে ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন, তা অর্জন করা সবার জন্য সম্ভব হয়ে উঠে না। কিন্তু মানুষের কোন বিষয়ে মন্তব্য করা এক ধরনের স্বহজাত স্বভাবের পর্যায়ে পড়ে। এই কারনে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে ‘কজ্যালিটি’ আমরা প্রয়োগ করি তা অনেক ক্ষেত্রেই ভুলপ্রবণ। যার ফলেই ক্যান্সার হলেই বলে দেই লোকটি বিড়ি ফুকায়। এইডস হলেই বলে দেই তার চরিত্র খারাপ।  

আর এরকম ভুলগুলো যে শুধু সাধারন মানুষ রাই করে থাকে তা নয় অতীতে দীর্ঘসময় ধরে বিজ্ঞানী, গবেষকগণরাও নিয়মিত ভাবে করে এই ভুল করে আসছিলেন এবং পরবর্তী নানান ঘটনার পুংক্ষুনা পংক্ষু গবেষণাগুলোতে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে যে তাদের ধারণা গুলো ভুল। যখন একটি ঘটনার ঘটে যাবার পিছনের কারণগুলো ভুলভাবে শনাক্ত করা হয়, তখন সেটাকে ‘ফলস কজ ফ্যালাসি’ (false cause fallacy) বলা হয়। ফ্যালাসি হচ্ছে বিভিন্নরকমের ভুল যুক্তি, যেগুলো স্বাভাবিক চোখে ধরা পড়ে না। ফলস কজ ফ্যালাসি বিভিন্নরকম হয়।

যে কোনো দুইটি ঘটনার মধ্যে অনেক ভাবেই সম্পর্ক থাকতে পারে। এই সম্পর্কটি অনেকসময়ে ‘কজ অ্যান্ড ইফেক্ট’-এর সম্পর্ক হতে পারে। আবার, না হতে পারে। ধরুন এই খানে কাকতালীয় সম্পর্ক হল। আর সাইকোলজির ভাষায় এরকম সম্পর্ক এর নাম ‘কোরিলেশন’ (correlation) বলে উল্লেখ করা হয়। এরকম কোরিলেশন দেখেই তাদের মধ্যে কজ্যালিটির সম্পর্ক আছে বা একটি ঘটনার জন্যে আরেকটি ঘটনা ঘটছে এরকম উপসংহার টানা একটি যুক্তিগত ভুল।

তাদের মাঝে কজ্যালিটির সম্পর্ক হয়তবা থাকতে পারে, তবে যথেষ্ট কারণ অনুসন্ধান করে এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আজাইরা মন্তুব্য করা থেকে নিজেকে বিরত রাখাই সব চেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ,শুধুমাত্র সম্পর্ক বিচার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে তা একটি অপযুক্তি তৈরি হতে বাধ্য। যেকোনো পরিস্থিতিতে কোন ঘটনা ঘটতে কোরিলেশনের পাশাপাশি আরো অনেকগুলো উপাদান থাকে। কোন ঘটনার পেছনে শুধুমাত্র একটি কারণ কাজ করে না,ঐ ঘটনার মধ্যে অনেকগুলো কারণের একটি জটিল সন্নিবেশ থাকে। তাই শুধুমাত্র কোরিলেশন দিয়ে কোনো একটি ঘটনার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। 

কিছুদিন আগে আমাদের মিডিয়ার এক মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে যায়। বছর খানেক আগে যখন মেয়েটির বিয়ে হয় সেই বিয়েটি অনেক ধুম ধামের সাথে হয়েছিল। কিন্তু তাদের রিলেশান ভেংগে যাবার সময় অনেক কেই অনেক কথা বলতে শুনেছি। মিডিয়ার মেয়েদের বিয়ে টেকে না। মেয়েটির চরিত্র খারাপ। কেউ কেউ ছেলে মেয়ে উভয়েই দোষ দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের ফোয়ারা ছুটিয়েছিল। কিন্তু অনেকেই হয়ত জানেন না, সম্পর্ক ভেংগে গেলে কতটা মানুষিক সমস্যার ভিতর দিয়ে যেতে হয়? কিংবা সম্পর্ক অনেক কারনেই ভেংগে যেতে পারে। এমন উদাহরন আমি হাজার টা দিতে পারি, যে শুধু মাত্র ছেলে অথবা মেয়ে ঘুমের ভিতর প্রচুর নাক ডাকে আর তার জন্য ডিভোর্স হয়ে গেছে। আরন্ডার্ট্যান্ডিং, কিংবা সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কিংবা এই জাতীয় জটিল প্রসঙ্গ না টানলেও চলবে।

যাই হোক এই বার মুল প্রসঙ্গে আসি, দুইটি ঘটনা ‘A’ ও ‘B’য়ের মধ্যে কয়েক ধরনের সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন: ‘A’য়ের কারণে ‘B’ ঘটেছে, ‘B’য়ের কারণে ‘A’ ঘটেছে, ‘A’ এবং ‘B’ উভয় ঘটনাই ভিন্ন কোনো ঘটনা ‘C’ এর কারণে ঘটেছে। ‘A’ এবং ‘B’ পরস্পর একটি অপরটির কারণে ঘটেছে অথবা ‘A’ ও ‘B’য়ের মধ্যে কোনোরকম সংযোগ নেই, তাদের মধ্যকার কোরিলেশনটা শুধুমাত্রই একটি কাকতালীয় ঘটনা। তাই, বড় পরিমাণ ডেটা থেকেও যদি দুইটি ঘটনার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ কোরিলেশন বা পারস্পারিক সম্পর্কের ছাপ পাওয়া যায়,তার পরেও চট করেই কজ্যালিটির উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা একটি মারাত্বক  ভুল হিসেবে পরিগণিত হতে বাধ্য। কিছু উদাহরণ দেখা যাক।

Image Source: Randall Munroe

B এর  কারণে A ঘটেছে

এই  জাতীয় ফ্যালাসিতে ‘কজ অ্যান্ড ইফেক্ট’-এর ক্রম ধারাকে উলটে দিয়ে চুরান্ত ফলাফলে আসা হয় । আরো সহজ ভাবে বললে, ‘কারণ ঘটনা’কে ‘ফল ঘটনা’ হিসেবে দেখা হয় এবং ‘ফল’কে ‘কারণ’ হিসেবে।

একটি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যে সব মানুষের বার্ষিক আয় অনেক বেশি, সেই সব মানুষদের বেশি সুখী অবস্থায় দেখা যায়।  এ থেকে সহজেই ফলাফলে আসা যায় যে, যারা বেশি আয় করে তারা জীবনে অনেক সুখী হয়। কিন্তু, ভিতরের খবর হল, সুখী মানুষ যেকোনো কিছুতে সহজে মনোনিবেশ করতে পারে। ফলে, যেকোনো কিছুতে তাদের দক্ষতা তৈরিতে তারা অন্যদের চেয়ে দ্রুত হয়। আর এরকম দক্ষতাগুলোই বাকিদের তুলনায় তাদের বেশি যোগ্য করে তোলে এবং তাদের আয়ের পথ আরো সুগম করে দেয়। তাই,আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, বেশি আয় মানুষের সুখী হওয়ার কারণ নয়, বরং সুখী মানুষের জন্যেই তার বেশি আয়ের পথ সুগম হয়।

ক এবং খ উভয়েই গ’য়ের কারণে ঘটেছে (the common-causal variable)

এই ফ্যালাসিতে মনে করা হয় যে, ‘A’ ঘটনার কারণে ‘B’ ঘটেছে যেখানে ‘A’ এবং ‘B’ উভয়েই ভিন্ন একটি ঘটনা ‘C ’ এর ফলাফল। অনেক সময় ‘C’ এর ঘটনাটি সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই কারণে, এই ঘটনাটির ব্যাপারে সাধারণত মানুষের ধারণা কম থাকে। 

মার্কিন যুক্তরাস্টের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক তাদের গবেষণায় দেখতে পান, যেসব ছোট বাচ্চাদের ঘুমের সময়ে বাতি জ্বালানো থাকে, তাদের মায়োপিয়া (ক্ষনদৃষ্টি, কাছের জিনিস দেখতে পেলেও দূরের জিনিস দেখতে পায় না) রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এখান থেকে সেই গবেষকরা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বাতি জ্বেলে ঘুমানো মায়োপিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার একটি কারণ। পরবর্তীতে গবেষণার ফলাফলটি নেচার সাময়িকীর ১৯৯৯ সালের একটি সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছিল। ঐ সময়ে গবেষণাটি সংবাদ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছিল।

পরবর্তীতে ওহায়ো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রা দেখেন যে, যেসব মা অথবা বাবার মায়োপিয়া বা ক্ষনদৃষ্টি রোগ রয়েছে, তাদের বাচ্চাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। আবার, মায়োপিয়া আক্রান্ত মা-বাবার তাদের বাচ্চাদের রুমে আলো জ্বেলে রাখার অভ্যাস রয়েছে। এভাবে, মা-বাবার মায়োপিয়া একইসাথে তাদের বাচ্চাদের রুমে আলো জ্বেলে রাখা এবং বাচ্চাদের মায়োপিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসেবে কাজ করে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রা এই কারণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। 

ফলস কজ ফ্যালাসির প্রকার ভেদ 

সিংগেল কজ ফ্যালাসি

অধিকাংশ ঘটনা পরিক্রমাতেই একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রবৃত্তিগতভাবেই কারণগুলোকে অনেক সহজভাবে বুঝার চেষ্টা করে। ফলে, তারা ঘটনাগুলোর পেছনে একটিমাত্র কারণই খুঁজে পায়। একে ‘সিংগেল কজ ফ্যালাসি’ বলা হয়।

 পোস্ট হক ফ্যালাসি

একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনা ঘটার ফলে, প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা আরেকধরনের ফ্যালাসি, যার নাম ‘পোস্ট হক ফ্যালাসি’। এখানেও যুক্তিগত মূল সমস্যাটি হচ্ছে, কোরিলেশন এবং কজেশনের মধ্যেকার অপ্রমাণিত সাদৃশ্য স্থাপনের চেষ্টা। একটি বিখ্যাত উদাহরণ দেওয়া যাক।

পেলে । ইমেজ সোর্স – banglainfotube.com

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সম্রাট পেলে তার একজন ভক্তকে একটি নির্দিষ্ট জার্সি উপহার দেওয়ার পর দেখা গেল পেলের পারফরম্যান্সে কিছু ভাটা পড়েছে। পরবর্তীতে, সেই ভক্তের কাছ থেকে জার্সিটি ফেরত নেওয়ার পর তার পারফরম্যান্স আবার ভালো হয়ে যায়। এই কারণে জার্সিটি উপহার দেওয়া তার পারফরম্যান্স খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে অনেক জায়গায় দাবি করা হয়েছিল। একইরকমভাবে, জার্সিটি ফেরত নেওয়া পারফরম্যান্স ঠিক হয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় যে, ফেরত পাওয়া জার্সিটি নকল ছিল।

চিকিৎসা বিজ্ঞানিদের গবেষণার অনেক ঘটনায় পোস্ট হক ফ্যালাসি খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন: দীর্ঘসময় ধরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত ব্যাক্তিদের পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল, রাতে খুব বেশি সময় যারা বাইরে কাটায়, তারাই বেশি সংখ্যায় ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হচ্ছে। এর পরে, ধারণা করা হয়েছিল যে, রাতের বাতাস ম্যালেরিয়া রোগের কারণ। কিন্তু বিজ্ঞানীদের এক্সপেরিমেন্টের এ ধারণাটি পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। আর আজকে আমরা সবাই জানি যে, অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়ায়।

পোস্টহক রিজনিংয়ের কারণে অনেকসময়ে অনেক যুক্তি ‘সিংগেল কজ ফ্যালাসি’তে রূপ নেয়। কিন্তু, যুক্তিটি যেহেতু পুরোপুরি মিথ্যা না, তাই একে ‘ইনফ্লেটেড কজ্যালিটি’ (inflated causality) বলা হয়। এরকম কিছু উদাহরণ হচ্ছে: 

১। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পেছনে কারণ ছিল হিটলারের ইহুদী প্রতি ঘৃণা। 

২/ জন এফ. কেনেডি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিচার্ড নিক্সনকে হারিয়েছিলেন শুধুমাত্র তাদের মধ্যে ঘটা টেলিভিশনের বিতর্কটি জেতার ফলে।

৩/ যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল দাসত্ব সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে।

টেক্সাস শার্প শ্যুটার ফ্যালাসি

এই ফ্যালাসিকে অনেকসময় ‘ক্লাস্টারিং ইল্যুশন’ও বলা হয়। একটি কাল্পনিক ঘটনা থেকে এর নামকরণ হয়েছে। একজন বন্দুকধারী কোনো একটি গুদামঘরের দেয়ালে এলোপাথাড়ি কিছু গুলি করলো। এরপরে সে এমন জায়গায় তার টার্গেটটি আঁকলো, যেখানে তার গুলিগুলো সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আঘাত করেছে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বন্দুকধারী তার অঙ্কিত টার্গেটে বরাবর গুলি করেনি কিন্তু কায়দা করে সে এমন জায়গায় টার্গেট এর চিত্র অঙ্কিত করেছে যে, বাইরে থেকে কেউ এসে তা দেখলে ভাববে যে, ওইটাই বন্দুকের নিশানা ছিল এবং সে চমৎকারভাবে নিশানাতে গুলি করতে পেরেছে। এভাবে ভুল উপসংহারে পৌঁছানো খুব সহজ। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

ইলেকট্রিক পাওয়ার লাইন গুলো কোনো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে কিনা, সে ব্যাপারে সুইডেনে একটি জরিপ হয়েছিল। ২৫ বছর ধরে হাই ভোল্টেজ লাইনের ৩০০ মিটার আশেপাশে তারা জরিপটি চালিয়েছিল। তাদের পর্যবেক্ষণে এসেছিল, যারা পাওয়ার লাইনের সবচেয়ে কাছে বাস করে, সেসব বাচ্চার চাইল্ডহুড লিউকেমিয়া চারগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু, তারা ৮০০টি রোগের ব্যাপারে নজর রেখেছিল। এই তালিকার একটি রোগও যদি কাকতালীয়ভাবে ঐ এলাকাগুলোতে ধরা পড়ে, তাহলেও জরিপটিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে এরকম ফলাফল দেখা যাবে। এতগুলো রোগের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে হলেও যেকোনো একটিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এভাবে, জরিপটি ফলাফল ভুল আসা খুবই স্বাভাবিক। এরকম ব্যাপারকে ‘মাল্টিপল কমপ্যারিজন প্রবলেম’ বলা হয়। সুইডেনের গবেষকদের জরিপটি ডিজাইন করার মধ্যে ভুল ছিল। পরবর্তীকালের অনেকগুলো গবেষণাই চাইল্ডহুড লিউকেমিয়ার সাথে পাওয়ার লাইনের সম্পর্কের দাবিটি প্রত্যাখ্যান করেছিল।

 অ্যাসোসিয়েশন ফ্যালাসি

দুইজন ব্যক্তি অথবা দুইটি ঘটনার মধ্যে কোনোরকম সাদৃশ্য থাকলে, তাদের অন্যসব কিছুতে জোর করে সাদৃশ্য স্থাপন করলে সেটাকে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফ্যালাসি’ বলে। একটু ব্যাখ্যা করা যাক। 

 ‘A’ হচ্ছে ‘B’য়ের অন্তর্ভুক্ত। 

আবার, ‘A’ হচ্ছে ‘C’য়ের অন্তর্ভুক্ত। 

অতএব, সকল ‘B’ এবং ‘C’ একই। 

ভেন ডায়াগ্রামের মাধ্যমে প্রকাশ করলে এই যুক্তির মধ্যকার ফ্যালাসিটি বুঝতে সহজ হবে।

এখানে, ‘A’ হচ্ছে ‘B’ ও ‘C’ সেটের সাধারণ (common) অংশ। কিন্তু ‘B’ ও ‘C’ উভয়ের সীমাই ‘A’ এর চেয়ে অনেক বড়। এবং সে জায়গাগুলোতে তারা ভিন্ন। শুধুমাত্র ‘A’য়ের সীমার মধ্যেই তাদের সাদৃশ্যটুকু বজায় রয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশন ফ্যালাসির সাধারণত দুইরকম রূপ দেখা যায়। একটি হচ্ছে, ‘গিল্ট বাই অ্যাসোসিয়েশন’ (guilt by association) এবং অন্যটি হচ্ছে ‘অনার বাই অ্যাসোসিয়েশন’ (honor by association)। গিল্ট বাই অ্যাসোসিয়েশনের একটি বহুল প্রচলিত উদাহরণ হচ্ছে।

তামিম ইকবাল খান প্রতিভাবান।

তামিম বাঁ হাতি।

বাঁ হাতি মানুষেরা প্রতিভাবান হয়।

অন্যদিকে, অনার বাই অ্যাসোসিয়েশনের সবচেয়ে বেশি প্রচলন দেখা যায় বিজ্ঞাপন মাধ্যমগুলোতে। সাধারণত, বিখ্যাত সেলেব্রিটি অথবা আকর্ষণীয় মডেলদের মাধ্যমে যেকোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন করা হয়। সেখানে তারা পণ্যটির নানা গুণগান গায়। এরকম সেলেব্রিটিদের জনপ্রিয়তা অথবা, মডেলদের প্রতি সাধারণ মানুষের আকর্ষণের ফলে পণ্যটিকেও গুণগতভাবে ভালো মনে হয়। সাধারণভাবে মানুষের মনে হয় যে, তারা সত্য বলছে।

ফলস কজ ফ্যালাসি আমাদের যুক্তিগত চিন্তাগুলো দূর্বল করে দেয়। সত্যিকার পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধারণাটি অনেক বেশি কৃত্রিম হয়ে যায়। তাই, যেকোনো চিন্তা ও যুক্তিচর্চায় এই ফ্যালাসি সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকা উচিত।

Exit mobile version