Site icon কালাক্ষর

থিওরী অফ মিউজিকঃ মানব মন ও মস্তিস্কে সঙ্গীত যে ভাবে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করে

থিওরী অফ মিউজিকঃ মানব মন ও মস্তিস্কে সঙ্গীত যে ভাবে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করে

মডেল - মৌ। ফাইল ফটো

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সঙ্গীত বা মিউজিক শব্দটির প্রভাব অনেক বেশি। সঙ্গীত  বলতে প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট ছন্দময় শব্দগুচ্ছের সমষ্টিকে বোঝানো হয় যা আমাদের মাঝে নান্দনিকতা ও অনুভূতির সঞ্চার করে। মানব বিবর্তনের প্রথম ভাগ থেকে (প্রায় ৫৫ হাজার বছর) এর সঙ্গী হিসেবে সঙ্গীত মানব সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো শিল্পের মতো সঙ্গীতের প্রাথমিক কাজ হলো মানুষের মন এবং মস্তিস্কে অনুভূতির সঞ্চার করা। যে সব বিষয়বস্তু সমূহ আমাদের মস্তিস্কে আনন্দ-অনুভূতির কেন্দ্র- ডোপামিন ক্ষরণের মাধ্যমে সেই কেন্দ্রকে সঙ্গীত সক্রিয় করে তোলে। এই ডোপামিনের ফলে জৈব-রাসায়নিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা ইতিবাচক উদ্দীপনার স্বাদ পাই।

সুর, তাল এবং লয় যা সঙ্গীতের প্রধান তিনটি উপাদান হিসেবে গন্য করা হয় এর সাথে আমরা সকলেই কম বেশি পরিচিত। সঙ্গীতে ‘লয়’ ব্যাপারটিকে উল্লেখ করা হয় একক সময়ে শব্দ বা তালের পরিমাপক হিসেবে, যা প্রতি সেকেন্ড (হার্জ) বা প্রতি মিনিট (বিপিএম) হিসেবে গণনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই যে, এই লয়ের পরিমাপের একটি সুস্পষ্ট প্রভাব মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণের মাঝে লক্ষ্য করা যায়। হৃদস্পন্দনের গতিবিধির উপরও এর প্রভাব লক্ষণীয়।

তানজিন তিশা। ছবি – facebook.com

সাধারণ ভাবে বলতে গেলে, বিটা তরঙ্গের সঙ্গীত (১৪-৪০ হার্জ) মানুষের মন-মস্তিষ্ককে দৈনন্দিন কাজের জন্য সর্বোচ্চ রকমের সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে, যার মধ্যে রয়েছে আধুনিক পপ ও রক সঙ্গীত। অপরদিকে আলফা তরঙ্গের সঙ্গীত (৮-১৪ হার্জ) আমাদের মাঝে প্রশান্তির অনুভূতি জাগ্রত করে। ব্লুজ, কান্ট্রি ও ফোক সঙ্গীত এই দলভুক্ত। ৪-৮ হার্জভুক্ত থিটা তরঙ্গের সঙ্গীত মস্তিষ্ককে মেডিটেশন, শান্ত ও স্বপ্নময় অনুভূতি প্রদান করে, অন্যদিকে ৪ হার্জের নিচের সীমায় অবস্থান করা ডেল্টা তরঙ্গের সঙ্গীত আমাদের ঘুমের জন্য সহায়ক অনুভূতি যোগায়। 

কালাক্ষর ব্লগে আমার লেখা পুরাতন পোস্ট গুলো পরতে নিচের দেওয়া লিংক গুলো ক্লিক করুন 

শিল্প কলার অন্যতম মাধ্যম সঙ্গীতের প্রভাব আমাদের ইন্দ্রিয়ের উপর দারূণ ইতিবাচক, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা যেকোনো ধরনের সঙ্গীত বা যেকোনো ধরনের গান শুনলে তা সরাসরি আমাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার উপর সক্রিয় প্রভাব বিস্তার করে, যা আমাদের আবেগ ও মৌলিক আচরণসমূহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আমরা কোন ধরনের সঙ্গীত শুনে অভ্যস্ত, তার উপর সঙ্গীতের কোন প্রভাব নির্ভর করে না। মূলত সঙ্গীতের প্রভাব নির্ভর আপনি কিং আমি কীভাবে সঙ্গীতের সাথে আপনার কিংবা আমার আবেগকে সংযুক্ত করতে পারছি, তার উপর।

শ্যাখস নামের এক দল গবেষকদলের ২০১৬ সালে করা এক গবেষণা মতে বলা হয়েছে, কোন মানুষ যদি কোনো একটি গানের সাথে নিজের আবেগকে কোনো ভাবে সংযুক্ত করতে পারে, তবে তার মস্তিস্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ অংশগুলোর সাথে মস্তিস্কের অডিটরি কর্টেক্সের মধ্যবর্তী সংযোজকস্থল হোয়াইট ম্যাটার নামে পরিচিত তার কার্যকারিতা তুলনা মূলক ভাবে অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়,যার ফলে সেই মানুষের মস্তিষ্ককে কার্যক্ষমতা পূর্বের চেয়ে বেশি সচল হয়ে যায়।

২০১৩ সালে প্রকাশিত US National Library of Medicine-এর তথ্য মতে, সঙ্গীত বিষয়ে প্রশিক্ষিত শিশুদের শ্রবণশক্তি অন্য সব সাধারণ শিশু যারা সঙ্গীত এর সাথে যুক্ত নয় তাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়, এর ফলে সেই সব শিশুদের দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ, শ্রবণ বিষয়ক স্মৃতি ও কার্যক্ষমতা অনেক বেশি ভালো ফলাফল প্রদর্শন করে।

লিডস্কগের ২০১৬ এর গবেষণা মতে, মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে সঙ্গীত  অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। সঙ্গীতপ্রেমীরা অনুসরণ বা অনুকরণের বদলে তার প্রিয় শিল্পীদের মতোই নিজেদের অব্যক্ত কথা তুলে ধরতে ও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে বেশি আগ্রহী হয়।

সঙ্গীত মানব মনে কেমন প্রভাব বিস্তার করে তার উপর ২০১১ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়, এই গবেষণার শুরুতে একদল মানুষকে একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়, কিন্তু নির্দিস্ট সময় পর দেখা যায় সেই সব লোকজন তাদের কাজ সন্তোষজনকভাবে করতে পারেননি। এরপর সেই লোকজ জন কে দুটি গ্রুপে বিভক্ত করে দুটি আলাদা কক্ষে রাখা হয়। কক্ষ দুইটির একটি কক্ষ সম্পূর্ণ শান্ত ছিল, আরেকটি কক্ষে মৃদু সঙ্গীত চালু রাখা হয়। পরবর্তীতে দেখা যায়, শান্ত কক্ষের চেয়ে সঙ্গীত চালু রাখা কক্ষে থাকা ব্যক্তিগণ পরবর্তীতে এই কাজ আবার করতে দেওয়া হলে তা পুর্বের চেয়ে আরো ভালোভাবে করার ব্যাপারে বেশি আশাবাদী ও ইতিবাচক ছিলেন। 

মডেল – মৌসুমি হামিদ ছবি – কালাক্ষর ডেক্স

সঙ্গীত মানুষের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং যুক্তিবাদী মস্তিস্ককে সক্রিয় করে তোলে। ইউনিভার্সিটি অফ ইলেনয় এর অধ্যাপক রবি মেহতার মতে [], ৭০ ডেসিবেল বা তার কম তীব্রতার সঙ্গীত মস্তিস্কের উপর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে, যা সৃজনশীল কাজকর্মে মানুষকে আগ্রহী ও সক্রিয় করে তোলে। এই তীব্রতার যেকোনো সঙ্গীত মানুষকে চিরাচরিত ভাবনা থেকে অনেকটাই নিজস্বতার দিকে ধাবিত করে এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে, যা যেকোনো সৃজনশীল কাজকর্মের জন্য সহায়ক মনস্তত্ত্ব তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিল্প কলার অন্যতম মাধ্যম সঙ্গীতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, সঙ্গীত যেকোনো মানুষের শারীরিক ব্যথা-বেদনা, মানসিক পরিশ্রান্তি দূরীকরণ ও সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সঙ্গিত নিয়ে প্রায় ১১টি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত রোগী যদি হাসপাতালে মৃদু সঙ্গীতময় পরিবেশে অবস্থান করেন,তাহলে তারা তাদের ঠিক সমপর্যায়ের আহত অন্য সব রোগীর চেয়ে বেদনা তুলনামূলক ভাবে অনেক কম ব্যাথা অনুভব করেন, কারণ সঙ্গীত তাদের মনের মাঝে স্বাচ্ছন্দ্য, শক্তি এবং ক্লান্তি দুরিভুত করবার অনুভূতি সঞ্চার করে। 

অধ্যাপক পিটার জ্যানাটা ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়াতে  ২০০৯ সালে মানব মনে সংগীতের প্রভাবের উপর পরিচালিত এক গবেষণা করেন,যে খানে বলা হয়েছে মানব মস্তিস্কের একটি অংশ রয়েছে, যা সঙ্গীতের সাথে সরাসরি জড়িত থাকে। পূর্বের জীবনের সাথে মানুষের আবেগের সংযোগ ঘটায়, এবং অতীতের যেকোনো ব্যক্তি, বস্তু বা স্থানের সাথে জড়িত এমন কোনো গান অ্যালঝেইমার্স রোগীদের ক্ষেত্রে অতীত স্মৃতির সাথে নিজেকে সংযুক্ত করতে কার্যকারিতা প্রদর্শন করে।

মানুষের স্মৃতিশক্তির উপর সঙ্গীতের প্রভাবের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সাবেক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য গ্যাব্রিয়েলে জিফোর্ডসের নাম উল্লেখ করা যায়। ২০১১ সালে তার মাথায় গুলি লাগায় তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। তার মস্তিস্কের ভাষা সংক্রান্ত স্মৃতি ও কার্যকেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং তিনি কথা বলার ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু পরবর্তীতে মিউজিক্যাল থেরাপি, গান গাওয়া ও সঙ্গীতের মাঝে থাকার মাধ্যমে তিনি মস্তিস্কের ভাষা কেন্দ্র পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করতে সমর্থ হন, এর ফলে গ্যাব্রিয়েলে জিফোর্ডসের পুনরায় ভাষা শিখতে এবং নির্ভুল ভাবে কথা বলতে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করে।

অধ্যাপক কস্তাস কারাজিওরঘিসের (ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়) এর মতে, ১২৫-১৪০ বিপিএম এর যেকোনো গান শারীরিক ব্যায়াম জাতীয় কাজকর্মে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। জাপানী বংশভুত ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার অধ্যাপক কিম ইনেস এর ২০১৬ সালে একটি গবেষণা করেন, যেখানে বলা হয়, বয়স্ক মানুষদের মস্তিস্কের যুক্তিবাদী ও গাণিতিক অংশের উন্নয়নে সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গান শুনলে আমাদের ঘুম ভালো হয় এবং ধৈর্যশক্তি বৃদ্ধি পায় বলেও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গিয়েছে। শারীরিক আর মানসিকক্ষেত্রে সঙ্গীতের অবদান তাই উল্লেখযোগ্য বলেই মেনে নেয়া যায়। 

থিওরী অফ মিউজিক

মানব মনে সংগীত কতটা প্রভাব বিস্তার করে তা উপরের আলোচনা পড়লেই আপনাদের বোঝার কথা। সঙ্গীতের যে সব মাধ্যম আছে তার মধ্যে গান হল সর্ব লোক সমাদৃত। গান দিয়ে মানুষের মনে অনেক বেশি দাগ কাটা যায় বলেই কালে কালে সমাজ পরিবর্তনে গান এক বিপ্লবিক দায়িত্ব পালন করে এসেছে। যুদ্ধরত সৈনিকের মনবল চাঙ্গা করতে রচিত হয়েছে রণ সঙ্গীত। স্রষ্টার আরাধনায় সৃষ্টি করা হয়েছে ভোজন সঙ্গীত, গজল। অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সমাজ পরিবর্তনের যোগ্য মাধ্যম হিসেবে সঙ্গীত নিজের আপন মহিমাকে সর্বচ্যশিখরে নিয়ে গেছে। তাই সবাই গান গাইতে চায়। গায়ক কিংবা গায়ীকা হতে চাইবে এইটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গায়ক বা গায়িকা হয়তো অনেকেই হতে পারে ,কিন্তু সকল গায়ক গায়িকা কি শিল্পী হয়ে ওঠে না ? একজন গায়ক তখনই শিল্পী হয়ে ওঠেন যখন তিনি আত্ম উপলব্ধি থেকে নিজের গান পরিবেশন করেন, এখানে তার গানের মান, মানবিকতা, সুকুমার বৃত্তি গুলোর উপর বিকাশ ঘটান। তাই একজন শিল্পীকে এক দিকে যেমন হতে হয় আত্ম মর্যাদা সম্পন্ন অন্য দিকে হতে হয় সুবিশাল হৃদয় ও মানবিক গুণাবলীর আধার সম্পন্ন। এক জন শিল্পীর গান গেয়ে অন্যকে আনন্দ দেওয়া ই হল তাঁর কাজ, টাকা আয় করে ধনী হওয়া নয়। তাই শিল্পী সর্বদা নিজগুনে শিল্পী হয়ে ওঠেন, শিল্পী কারো দ্বারা প্রভাবিত হয় না,এক জন শিল্পীকে হতে হয় নিরঅহংকারী, বড় মনের মানুষ। এক জন শিল্পী সব কিছুর মধ্যে খোঁজেন নান্দনিকতা । এক জন শিল্পী অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ান না, অন্যের সমালোচনা করেন না বরং মানুষের ছোট খাটো দোষ ত্রুটি গুলো আড়াল করে তাঁর ভিতরকার গুণ গুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন , যা আমরা মান্না দে, মোহম্মদ রফি, ভূপেণ হাজারিকা এমন কি রবীন্দ্র – নজরুল প্রমুখ মহান ব্যক্তিত্বদের বিভিন্ন সময়ের সাক্ষাৎকার শুনলে বুঝতে পারি।
যেমন ফুল কিন্তু নিজের জন্য ফোটেনা, সে অন্যের জন্য গন্ধ ছড়ায় এবং নিজের সৌন্দর্য দিয়ে অন্যদের মুগ্ধ করে । আর তার জন্য ফুল কারুর প্রশংসা ও চায় না । প্রশংসা পাবার আশায় যে কাজ করা হয় ,তার মধ্যে অহং বোধ চলে আসে । সুতরাং আসুন প্রশংসা পাবার আশায় নয় বরং সকলের জন্য যা কল্যাণের , সকলের জন্য যা মঙ্গলের সেই কাজ করি ।

শিল্পকলার প্রতিটি ধাপ আমাদের মানব সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুর ও ভাষার মিশেলে সৃষ্টি হওয়া ‘সঙ্গীত’ নামের শিল্প কলার এই শিল্পটিও আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দাড়িয়েছে তা অস্বীকার করার মত মানুষ হয়ত দুনিয়াতে একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষের দৈনন্দিন ব্যস্ততা, ক্লান্তি, একাকিত্বে সঙ্গীত যেন অদৃশ্য বন্ধু হিসেবে সব সময় পাশে থাকে। আর তাই এই ‘আনসাং হিরো’র ইতিবাচক অবদানসমূহের প্রতি রইলো কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। যতদিন বেঁচে থাকবে পৃথিবী, বেঁচে থাকুক সঙ্গীত ও শিল্পকলার মহিমা।

Exit mobile version