Site icon কালাক্ষর

তোপধ্বনির ইতিহাস

তোপধ্বনির ইতিহাস:- 

ইতিহাস ডেক্সঃ- কোন দেশের পক্ষে সর্বচ্য সম্মান জানাতে তোপধ্বনির ব্যাবস্থা করা হয়। কিন্তু আমরা কয়জন ই বা জানি তোপধ্বনির আসল ইতিহাস, এইটা কখন থেকে কেন প্রচলন হয়েছে? হযবরল – সৃজনশীল ব্লগ “কালাক্ষর” এ আজ আমরা এই তোপধ্বনি সম্পর্কে জানবো। সামরিক অভিবাদন ও ইতিহাস পোস্ট মর্টেম করলে দেখা যায় যে ৩১ বার তোপধ্বনির অর্থ হল, প্রতীকী সম্মান বা স্মরণ। তোপধ্বনির আরেকটি অর্থ হল, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে সম্মান প্রদর্শন করা । বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের শুরুতে ৩১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয় মূলত জাতির সূর্য সন্তান যারা ভোর এনে দিয়েছিল , যাদের রক্তের অক্ষরে লেখা হয়েছে বাংলাদেশের নাম, তাঁদের প্রতি সর্বাগ্রে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন ও স্মরণ করতে, তাঁদের ত্যাগের কথা যে আমরা ভুলিনি তা জানাতে। এটিকে জাতির বীর সন্তানদের প্রতি সামরিক অভিবাদনও বলা যেতে পারে।

চলুন দেখে নিই ৩১ বার তোপধ্বনি ইতিহাস :

১. তোপধ্বনি দেয়ার রীতিটি এসেছে নৌবাহিনী থেকে । এর মূলরীতি কিন্তু ২১ বারই দেয়া। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দেশগুলো এই নিয়মের কিছুটা পরিবর্তন করে ৩১ বারে টেনে আনা হইছে। বিষয়টা হচ্ছে এমন যে, যখন কোন যুদ্ধ জাহাজ বন্দর বা ঘাঁটি ছেড়ে বের হয় তখন সেই জাহাজ থেকে ৭ বার তোপধ্বনি দেয়া হয়। ঘাঁটিতে বা বন্দরে অর্থাৎ মাটিতে সৈনিকদের যে দল বা ব্যাটারি থাকে তারাও সেই তোপধ্বনি জবাবে ২১ বার তোপধ্বনি করে সম্মান প্রদর্শন করে। জাহাজ থেকে ৭ বার, মাটি থেকে ২১ বার মোট ২৮ বার তোপধ্বনি করার পর জাহাজ থেকে আরো ৩বার তোপধ্বনি করা হয়। সেই অতিরিক্ত তিনটা তোপধ্বনির একটা করা হয় ব্রিটিশ রাজা বা রানীর সম্মানে, অন্যটা জাহাজের ক্যাপ্টেনের জন্য এবং শেষটা হচ্ছে ব্রিটিশ বাহিনীর রাজকীয় প্রতিনিধির জন্য।

এই তোপধ্বনির দেয়ার রীতির শুরু হয়েছিল ১৬শ শতকের শেষের দিকে আর এর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সতেশ শতকের প্রথম দিকে। সে সময়ে নৌ বিদ্যায় যারা পারদর্শি ছিল তারাই পৃথিবী বেশি রাজত্ব করত। ফলে অধিকাংশ যুদ্ধই হতো নৌ পথে। এই রীতিতে বুঝানো হয়, যখন কোন যুদ্ধ জাহাজ তার সকল গোলাবারুদ শেষ করে ফেলে নতুন করে আবার রিলোর্ড করা পর্যন্ত সে অসহায় থাকে, তখন তার আর পরাজিতদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না। এই অবস্থায় জাহাজটি যখন স্থলভাগের সৈনিকদের কামানের গোলার আওতায় খালি হাতে থাকে তখন তা একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেরও ইংগিতও দেয়। তাই বিদেশের বন্দরে যখন কোন যুদ্ধ জাহাজ প্রবেশ করে তখন তোপধ্বনি করার মাধ্যমে তারা সেই দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কে সম্মান প্রদর্শন করে।
২. আস্তিক বা নাস্তিক, হিন্দু বা মুসলমান, ধনী বা নিধন কিংবা পূণ্যাত্মা বা পাপাচারী যে যেমনই হোক, কয়েকশ বছর ধরে এইসব রাজারাই ব্রিটিশ শাসনের নিশ্চিত স্তম্ভ ছিল। এদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই ইংরেজরা এদেশে ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতিতে শাসন কাজ চালিয়ে গেছে। জায়গিরভোগী এইসব গোলামদের (রাজাদের) কাকে কতখানি সম্মান দেয়া হবে তা নির্ধারণ করার একটা অদ্ভুত পদ্ধতি আবিস্কার করেছিল ব্রিটিশ ক্রাউন। এই মাপকাঠিটা হলো রাজাদের সম্মানে তোপধ্বনির সংখ্যা।
রাজতন্ত্রের কাঠামোতে কোন রাজার স্থান কোথায় হওয়া উচিত তা নির্ণয় করতো এই তোপধ্বনি। একমাত্র বড়লাট বাহাদুরই নির্বাচন করতেন কোন দেশীয় রাজার সম্মানে কতগুলি তোপদাগা হবে। তবে উল্লেখ্য যে, রাজ্যের আয়তন বা জনসংখ্যা এর বিচারের মাপকাঠি ছিল না। বড়লাট সাহেব রাজ্যের সমৃদ্ধি, রাজরক্তের কৌলিণ্য আর সর্বোপরি ব্রিটিশরাজের প্রতি তাদের আনুগত্যবোধ এর উপর নির্ভর করে এই তোপ দাগানোর সংখ্যা নির্ধারন করতেন । এবং এক মাত্র তিনিই তোপধ্বনির সংখ্যা বাড়াতে বা কমাতে পারতেন।
পাঁচটি প্রধান জায়গিরভোগি রাজা যেমন,হায়দ্রাবাদ, বরদা কাশ্মির, গোয়ালিয়র, মহিশুর রাজ্যের রাজার জন্য বরাদ্ধ ছিল ৩১ বার তোপধ্বনির সম্মান। বাকি রাজারা ক্রমানুসারে কেউ পেত ১৯, কেউ পেত ১৭, কেউ ১৫ কিংবা ৯টি তোপের আখ্যা। তবে মোট ৪২৫ জন রাজা, নবাব বা জমিদারের কপালে একটা তোপধ্বনিও বরাদ্দ ছিলনা। বলতে গেলে এইসব হতভাগ্য ভুস্বামীরা প্রায় বিস্মৃতই ছিল। ব্রিটিশ ক্রাউনের নেকনজর কোনদিনই পায়নি তারা। তাদের সম্মানে কোনোদিন একটি তোপও দাগা হয়নি। তোপধ্বনির আদি ইতিহাস এটাই বা ৩১ বার তোপধ্বনির উৎপত্তির ইতিহাস এটাই।
দু:খজনক হল, এই অর্থহীন উপনিবেশিক গোলামী রীতি ৩১ তোপধ্বনি এখনো এই দেশে চালু আছে। এটার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

Exit mobile version