1. sjranabd1@gmail.com : Rana : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
মোঙ্গল বাহিনীর যুদ্ধ জয়ের কৌশল গুলো কি ছিল? - কালাক্ষর
রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন

মোঙ্গল বাহিনীর যুদ্ধ জয়ের কৌশল গুলো কি ছিল?

  • Update Time : বুধবার, ২ জুন, ২০২১
মঙ্গোল দের যুদ্ধ কৌশল
মঙ্গোল যোদ্ধা। ইমেজ সোর্স - uhdpaper.com

কথায় আছে প্রতিটি মোঙ্গল পুরুষ জন্ম দিন থেকেই যোদ্ধা, আর মেয়েরা যুদ্ধের সহযোগী। মাত্র তিন বছর বয়সে মোঙ্গল শিশুদের ঘোড়ার পিঠে বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হতো। তারপর ঘোড়াকে ছুটানো হত পূর্ণ গতিতে। ছয় বছর বয়স নাগাদ এই শিশুরা নিজেরাই পুরোদস্তুর ঘোড় সওয়ার হয়ে উঠত। দশ বছর বয়সের মধ্যে তারা শিখে যেত তিরন্দাজি। যে পুরুষ তীর চালাতে আর ঘোড়ায় চড়তে পারতো না, মোঙ্গলদের সমাজে তার পক্ষে বেঁচে থাকা ছিল প্রায় অসম্ভব।

শুধু কি পুরুষ? মোঙ্গল সমাজের মেয়েরাও পুরুষের সাথে সমান তালে ঘোড়ায় চড়তে জানত, জানত তির চালাতে। আর মঙ্গোল রা এসব শিখতো তাদের কঠিন পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে বেচে থাকতেই । কারণ যাযাবর এই জাতীর লোকজনের বসবাসের জন্য নিত্যনতুন জায়গা ত্যাগ করতে হত। শিকার করা আর প্রতিদ্দন্দি কাফেলার সাথে যুদ্ধ করেই তাদের স্থান নির্বাচন করতে হত। তাই তাদের চলার জন্য ঘোড়া আর টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ করা শেখা ছাড়া কোন উপায় ছিল না।  মোঙ্গলরা সওয়ার হিসেবে এতই দক্ষ ছিল যে, তারা পূর্ণ বেগে চলা ঘোড়ার ওপর থেকে নিখুঁতভাবে তির চালাতে পারত। তারা যে কোন সময় ঘাড়ার পিঠ থেকে একদিকে কাত হয়ে ঘোড়ার পেটের সঙ্গে লেগে থাকতে পারত। তির চালাত ঠিক তখন, যখন ঘোড়ার চার পা মাটি থেকে শূন্যে থাকত। এতে তিরের নিশানা থাকত নিখুঁত। এমনকী তারা উলটো দিকে ফিরেও একই দক্ষতায় তির চালাতে পারত। তাদের ধনুকের পাল্লা ছিল প্রায় দুইশো থেকে সাড়ে তিনশো মিটার। চীনাদের ধনুকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এই পাল্লার কারণে তারা অনেক অনেক দূর থেকেই শত্রুকে ঘায়েল করতে সক্ষম ছিল।

মোঙ্গল রা দৈহিক ভাবে আকারে ছিল ছিল ছোট প্রকৃতির। তারা সম্মুখ যুদ্ধে কারো সাথে পেড়ে উঠবেনা জেনেই ভিন্ন এক পন্থায় যুদ্ধ করতো। যুদ্ধের ময়দানে  মোঙ্গলরা শত্রুর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যেত না। তাই মোঙ্গলদের বেছে নিয়েছিল পার্থিয়ান শট নামের দূর্দান্ত এক কৌশল। পার্থিয়ান শট হল এমন এক যুদ্ধ কৌশল যে খানে শত্রুর সামনে থেকে হঠাৎ ভয় পেয়ে  ঘোড়া  নিয়ে উলটোদিকে ঘুরিয়ে পালানো ভান করা। এর ফলে শত্রুরা স্বভাবতই তাদের পিছু নিত। পালানো ভান করা অবস্থাতেই হঠাৎ ছুটন্ত ঘোড়া থেকে পেছন ফিরে তির মেরে তারা শত্রুর বুক এফোড় ওফোঁড় করে দিত, আর এই ফাঁদে একবার পড়ে গেলে বেঁচে ফেরা যে কারও জন্যই কঠিন হয়ে যেত। তারা শত্রুকে গায়ের জোরে নয়, বুদ্ধির খেলাতে হারিয়ে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে আসত, এই পদ্ধতি তে তারা এতটাই সফল হয়ে উঠেছিল যে তাদের নামের সাথে অজয় মানে যারা কোন দিন হারে না এমন তকমা লেগে যায়।  তাদের সাথে যুদ্ধ করা মানে  পরাজয় অবধারিত এমন টা ভেবে নেওয়া হত।

চেঙ্গিজ খান খুব বিচক্ষনতার সাথে তার সমর নীতি প্রয়োগ করতেন। তিনি   যেখানে তিনি জিততে পারবেন না এমন কোন যুদ্ধেই জড়াতেন না,যদি তাদের সাথে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হত তবে তিনি স্রেফ কৌশলে সেই যুদ্ধ এড়িয়ে যেতেন। শত্রুর হাড়ির খবর জানতে যুদ্ধের কয়েক মাস বা কয়েক বছর আগেই তিনি শ্ত্রু পক্ষের রাজ্যে প্রচুর গোয়েন্দা নিয়োগ করতেন। ঐতিহাসিক দের মতে, বড় যুদ্ধ গুলোতে চেঙ্গিজ খানের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ, তিনি শত্ৰুর বাহিনীর গঠন, যুদ্ধ কৌশল আর শ্ত্রু উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতেন। এর ফলে চেঙ্গিস খানের পক্ষে শত্রুর পরবর্তী চাল আন্দাজ করা ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ থেকে সহজতর হত। তার নিয়োগ প্রাপ্ত গোয়েন্দারা প্রায়ই শত্রুবাহিনীর ভেতরে যে সব কমান্ডার তাদের সম্রাটের বিরুদ্ধে ক্ষেপে আছে কিংবা কোন কারনে অসুনতষ্ঠ আছে, তাদের চিহ্নিত করত এবং সুযোগ বুঝে তাদের নানান রকম টোপে ফেলে তাদের নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নিত। মোঙ্গলরা যুদ্ধের ময়দানে  লড়াই এর সময় সাধারণত তাদের দুরন্ত ক্যাভালরি নিয়ে শত্রুর যে কোন একটা ফ্ল্যাঙ্ক কিংবা সম্ভব হলে কখনো দুই ফ্ল্যাঙ্কই ভেঙে ফেলত। এটা ছিল তাদের যুদ্ধের  প্রাইমারি ট্যাকটিক্স। এই ট্যাকটিসে কাজ না হলে মঙ্গল রা অনেক সময় একটা দুর্বল বাহিনী পাঠিয়ে শত্রুকে লড়াইয়ে নামতে উদ্বুদ্ধ করত। এবং হেরে যাবার ভান করে শত্রুদের এমন এক জায়গায় নিয়ে আসতো যেখানে আগে থেকেই তাদের মূল বাহিনী চতুর্দিকে লুকিয়ে আছে।

লড়াই শুরুর পর যখন শ্ত্রু সেনা চার দিক থেকে নিজেদের শ্ত্রু সেনা দ্বারা ঘেরাও অবস্থায় দেখতে পেত তখন সাধারণত কোন বীর সেনাপতি জীবন বাজি রেখে বিশৃঙ্খল ভাবে শত্রুকে আক্রমণ করেন। আর সেই সুযোগ নিয়ে মঙ্গল রা সুসজ্জিত হয়ে শ্ত্রু সেনাকে যাস্ট কচুকাটা করতো।

আবার এমনো দেখা গেছে, মঙ্গল রা চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে শত্রুসেনাদের   পালানো একটা ছোট পথ রেখে দিত ইচ্ছে করেই। আর পথ রেখে দিত শত্রুর একেবারে সামনেই। ফলে শত্ৰু চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে শ্ত্রু পক্ষ লড়াই করার ঝুঁকি না নিয়ে  মঙ্গলদের ওই রেখে দেওয়া পথ দিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাত। কিন্তু পলায়ন রত শ্ত্রু সেনার দল আন্দাজ ও করতে পারতো না তাদের জন্য কি বিভীষিকা অপেক্ষা করছে, শ্ত্রুদের পালিয়ে যাবার পথের শেষের দিকে  মঙ্গল রা  লুকিয়ে রাখতো এক সুজ্জিত মোঙ্গল তিরন্দাজের দল। এই লুকিয়ে থাকা তীরন্দাজ দল পলায়নরত শ্ত্রু পক্ষের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে তির মেরে শত্রুদের মেরে সাফ করে ফেলত।

মোঙ্গল ডার্বি

মোঙ্গল ডার্বি । ছবি – equestrianists.com

মোঙ্গল বাহিনী কঠোর পরিশ্রম করে শিখেছিল যুদ্ধ করার নানান কৌশল।  ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন ট্যাকটিক্স গুলোর মধ্যে একটি হল ফেইন্ড রিট্রিট বা ছদ্ম পলায়ন হল মঙ্গোল দের সব চেয়ে সুচতরু চাল। লড়াই করতে করতে হঠাৎ একটা সময়ে পুরো মোঙ্গল বাহিনী পিছু হটে পালান অভিনয় করত। এতে শত্রু সেনাদের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যেত। তারা মহা সমারোহে মঙ্গলদের ওপর ঝঁপিয়ে পড়ত। এভাবে শত্রুদের নিজেদের পছন্দমত জায়গায় নিয়ে এসে তারা ঝঁপিয়ে পড়ত শত্ৰুদের ওপর, শুরু হত হত্যাযজ্ঞ। শত্রু সেনার ঘন সন্নিবিষ্ট ব্যাটল ফরমেশনগুলোর বিপরীতে ঝাঁকে ঝাঁকে তির মেরে মঙ্গোল বাহিনী তা ভেঙে ফেলত। মোঙ্গলদের শক্তিশালী তির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শত্রু সেনার গায়ে দেওয়া চামড়ার বর্ম ভেদ করে ফেলত। কোন কোন ক্ষেত্রে ধাতব বর্মও। ফরমেশন ভেঙে পাতলা হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে শুরু মঙ্গল রা শুরু করতো হেভি ক্যাভালরি চার্জ। বলা হয়ে থাকে এটা ছিল মোঙ্গলদের চূড়ান্ত আঘাত।এর ফলে কাতারের পর কাতার শত্রুরা লাশ হয়ে পরে থাকতো। লাশে ভড়ে যেত যুদ্ধের ময়দান।

ঐতিহাসিকদের মতে, মঙ্গলদের এই চেইনের মত সাজানো একের পর এক আক্রমণ মঙ্গোলদের অব্যার্থ কৌশলের একটি। মঙ্গলদের যুদ্ধ কৌশলের এই ফিল্ড স্ট্র্যাটেজি গুলো বাস্তবায়ন করতে দরকার যুদ্ধ বাহিনীকে দ্রুতগতির হতে হয়, সাথে সাথে হতে হয় সুশৃঙ্খল, আত্মবিশ্বাসী এবং হিসেবি। মঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খান বছরের পর বছর ধরে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের বাহিনীকে গড়ে তুলেছিলেন নির্মম এক যুদ্ধের মেশিন হিসেবে। চেঙ্গিস খান তার সেনাপতিদের ওপর চরম আস্থা রাখতেন। চেঙ্গিস খান যুদ্ধ ক্ষেত্রে তার কমান্ডারদের দিয়েছিলেন নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবাধ স্বাধীনতা।  এর ফলে কমান্ডার দের পক্ষে যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে গিয়েছিল।

মোঙ্গলরা ব্যক্তিগতভাবে যোদ্ধা হিসেবে জন্মালেও তাদের অধিকাংশ প্রতিপক্ষের দৈহিক কাঠামো চেয়েই ছিল ছোট, আকারে খৰ্বকায়, এবং শারীরিকভাবে দুর্বল আর অশিক্ষিত। কিন্তু এত কিছুর কমতির মাঝেও তারা এগিয়ে ছিল সাহস, একতা, আর আত্মবিশ্বাসে। মঙ্গল রা বিশ্বাস করত তারা ঈশ্বরের মনোনীত এক বিশেষ জাতি, পৃথিবীতে যাদের পরাজিত করা অসম্ভব। পর পর যুদ্ধ জয়ের ফলে তাদের মনে বিশ্বাস জন্মেছিল, চেঙ্গিজ খান কখনোই পরাজিত হবেন না। তাই তারা ছিল নেতার প্রতি চরমভাবে অনুগত এক জাতি। বিখ্যাত পর্যটক জিওভান্নি লিখে গেছেন-

The Tatars that is, the Mongols-are the most obedient people in the world in regard to their leaders, more so even than our own clergy to their superiors. They hold them in the greatest reverence and never tell them a lie’.

যুদ্ধে জিততে যে গুণ গুলোর প্রয়োজন তার সবগুলাই মঙ্গোলদের ভেতর পুরোমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এক অপ্ররুদ্ধ যোদ্ধা জাতী হিসেবে তাদের আরও অনেক এগিয়ে দিয়েছিল তাদের সরবরাহ, কৌশল আর বাহন।  

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: