Site icon কালাক্ষর

ব্ল্যাক ডেথ : ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক মহামারী

ব্ল্যাক ডেথ

ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ রোগের চিকিৎসকের পোশাক। ইমেজ সোর্স - গুগল

বর্তমান কালে আমরা করনা নামক মহামারীর ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। আর এই করনার প্রকপে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে। জন জীবন হয়ে পড়ছে বিপর্যস্থ। কিন্তু আপনি কি জানেন? পৃথিবীতে মহামারীর ইতিহাস নতুন নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে মহামারীর তান্ডব কতটা ভয়াবহ ছিল ইতিহাস ঘাটলে তা সহজেই জানা যায়। মহামারীর ইতিহাসে সব চেয়ে আলোচিত একটি মহামারী ছিল ব্ল্যাক ডেথ (Black Death) । যার সবচেয়ে পরিচিত নাম হলো প্লেগ রোগ।

ব্ল্যাক ডেথ কি?

ব্ল্যাক ডেথ যার অন্য নাম প্লেগ একটি জীবনঘাতী রোগ। এক প্রকারের ব্যাকটেরিয়া যার বৈজ্ঞানিক নাম Yersinia pestis এই রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। ফ্রান্স-সুইস ব্যাকটেরিওলজিস্ট আলেকজেন্ডার ইরসিন এই ব্যাক্টেরিয়া সম্পর্কে সর্বপ্রথম ধারনা দেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক এটি বিশ্বের ভয়ংকর প্রাণঘাতী তিনটি রোগের একটি হিসেবে চিহ্নিত ছিলো (সুত্র উইকিপিডিয়া)। ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ রোগ অতি প্রাচীনকালীন এক ব্যাধি, ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় প্রায় ৩০০০ বছর পূর্বে এর অস্তিত্ব ছিল । এই রোগের ফলে সৃষ্ট মহামারীতে মধ্য যুগে দুনিয়াতে বিরাজমান বহু রাজ্য এ রোগ দ্বারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ এর লক্ষন হিসেবে প্রথমে রোগীর শরীরে প্রথমে কালো ফোস্কা বা টিউমারের মতো হতো। এরপর এই ফোস্কা গুলো কয়েক দিনের ভিতর বড় হয়ে সারা শরীর ময় ছড়িয়ে পড়তো। আর এই ফোস্কার ফলে রোগী অসহনীয় যন্ত্রণায় ভুগতে ভুগতে মাত্র তিন থেকে সাত দিনের মাথায় মারা যেত। প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৩৩০ থেকে ১৩৫০ সালের মধ্যবর্তি সময়ে  পৃথিবীর প্রায় ২০ কোটি মানুষ মারা যায়। ১৩৪০ এর শুরুর দিকে ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ রোগটি চীন, ভারত উপমহাদেশ, সিরিয়া ও মিশরে ছড়িয়ে পড়ে। ব্ল্যাক ডেথ ১৩৪৮ সালের দিকে ইউরোপে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ধারণা করা হয় যে, ‘ব্ল্যাক র‌্যাট’ নামে এক প্রজাতির ইঁদুরের মাধ্যমে প্লেগ রোগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া Yersinia pestis ইউরোপে এসেছিল। সে সময় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে এ ইঁদুরের প্রচণ্ড উপদ্রব ছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইউরোপের কয়েক কোটি মানুষ প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ইউরোপের তৎকালীন জনসংখ্যার ৩০ থেকে ৬০ শতাংশই সে সময় প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ইউরোপের জনসংখ্যা স্বাভাবিক হতে সময় লাগে প্রায় ১৫০ বছর। এসময় মোট ২০০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ব্ল্যাক ডেথে হয়েছিলো বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।

কিভাবে ছড়ায় ব্ল্যাক ডেথ

প্রথমদিকে একজনের থেকে অন্যজনের শরীরে ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ রোগটির কীভাবে সংক্রমণ হয়েছিল তা কেউ জানত না। জানত না এই  ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ রোগ প্রতিরোধের উপায়। তখন এই  ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ রোগ টির চিকিৎসা করা হত  গুজব এর উপর ভিত্তি করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় তখনকার একজন ডাক্তারের মতে, ‘যখন রোগীর মৃত্যুর সময় আত্মা চোখ দিয়ে বের হয়ে যায় তখন তা কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সুস্থ মানুষকে আঘাত করে অসুস্থ করে তোলে।’ তবে অনেক পরে ধারণা করা হয়, ইঁদুর থেকে ব্যাকটেরিয়াটির সংক্রমণ ঘটেছিলো। যদিও ইঁদুর ছাড়াও  ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ এর জন্য মাছিকেও দায়ি করে থাকে।

ব্ল্যাক ডেথ মহামারী। ছবি – সংগ্রহিত

কুসংস্কারযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি

ফিচার ফটোতে কালো টুপিওয়ালা এবং লম্বা মুখোশওয়ালা ছবি দেখে হয়ত ভেবেছিলেন এগুলো কি? মজার তথ্য হচ্ছে যে, সে সময়ের ডাক্তাররা  ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ এর সংক্রামণ এড়াবার জন্য ঐ টাইপের পোষাক পরতেন।  শুধু কি তাই? সে সময়ে অনেক বিতর্কিত চিকিৎসা পদ্ধতির চালু হয়েছিল। এর ভিতরে একটি ছিল সুগন্ধী চিকিৎসা , এসময় ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ এর জন্য সুগন্ধী ব্যাবহার করার পরামর্শ দেয়া হতো।

মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম কিংবা ইউরোপের খ্রিষ্টান সমাজে বেশ বড় ধরণের একটি গুজব ছিল ব্ল্যাক ডেথ সৃষ্টিকর্তার গজব।  ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ রোগের গজব দিয়ে তাদের সৃষ্টিকর্তা পরীক্ষা করছেন। সেসময় খ্রিষ্টান ক্যাথলিকদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের গায়ে নিজে চাবুক মেরে সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করার কথাও শোনা গেছে।

চুনি-পান্না অথবা মূল্যবান রত্নের গুড়ো অনেকে ঔষধ হিসেবে সেবন করত, কেউ কেউ মনে করত নর্দমার পরিবেশ এ রোগের জন্য উপকারী। সে সময় বাজারে ছড়িয়ে পড়া ভেজাল বেশকিছু ঔষধও ছিল মৃত্যুর কারন, আর্সেনিক , পারদ প্রভৃতি পদার্থের ঔষধেরও নজির রয়েছে । শোনা যায় ভয়াবহতা এতটাই মারাত্বক ছিল যে মানুষ মল মূত্র পর্যন্ত গায়ে মাখত সুস্থ হওয়ার জন্য। এসময় ইহুদীদের দায়ী করে অনেক ইহুদী হত্যা করা হয়।

ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগ রোগটি পুরো পৃথিবীর ইতিহাস, সাহিত্য সংস্কৃতি, গবেষনা , বিজ্ঞান গবেষণায়  বিশাল ছাপ রেখে গেছে । এই প্লেগ এর মহামারিতে মধ্যযুগে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর ফলে ইউরোপের পুরনো সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে নতুন রুপ দিয়েছিলো। মানুষের ভিতর বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। মান্ধাত্বা আমলের ক্যাথলিক চার্চ অনেকটাই তার প্রভাব হারিয়ে ফেলে এবং আধুনিক প্রটেস্ট্যান্টনিজম শুরু হয়। প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ এর সময়কার সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক আলবেয়ার কামু’র লেখা দা প্লেগ নামের বইটি পড়ে ফেলতে পারেন চট করে। গল্পের ছলে জানতে পারবেন সে সময়ের পৃথিবীর সামাজিক চিত্রগুলো ।

Exit mobile version