1. sjranabd1@gmail.com : Rana : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
জুতার ইতিহাস ও বিবর্তন - কালাক্ষর
শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন

জুতার ইতিহাস ও বিবর্তন

  • Update Time : শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

পাঠক শেষ কবে খালি পায়ে বাইরে গেছেন? কিংবা কবির ভাষায় নগ্ন পায়ে রাস্তায় হেটেছেন? আমি জানি এর উত্তর আপনি হয়ত দিতেই পারবেন না, কারন আপনি যে খানে গেছেন যে পরিস্থিতি তেই গেছেন, আপনার নিত্য সঙ্গী হিসাবে আপনার পায়ের সাথে এক জোড়া জুতা কিংবা স্যান্ডেল সাথে সাথেই গেছে। বর্তমান কালে মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় সঙ্গী হল জুতা, তাই জুতাহীন পৃথিবীর কথা ভাবতে গেলে ভারী বিস্ময় জাগে। জুতা ছাড়া হাঁটব কী করে! 

আর তাই আপনার মনে যদি প্রশ্ন আসে একদা শুধু বাস্তব প্রয়োজনের নিমিত্তে তৈরি হওয়া এই জুতা নামক পরিধেয়টি দেখতে দেখতে কেমন শিল্পসমন্বিত ও সুষমামণ্ডিত রমরমা শিল্পের চেহারা নিয়ে নিল। তখন আপনার অবাক হতেই হবে। হয়ত কারো কারো মনে জুতার এই বিবর্তনের ইতিহাস ঘাটার কৌতূহল দীপ্ত ক্ষুধা তৈরি হতে পারে। সৃজনশীল ব্লগ কালাক্ষর এর আজকের আয়োজন আপনাদের কৌতূহল দীপ্ত ক্ষুধা নিবারনের জন্যই । ইতিহাসের চোরা গলি ছেকে আজ আমরা জুতার আবিষ্কার, বিবর্তনীয় ইতিহাস, এবং প্রচলন নিয়ে আ্লোচনা করবো। 

পাঠক, এটা ঠিক যে বিশ্বের সমস্ত জুতোরই কিছু সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। তবু রঙ, উপাদান, নকশা কিংবা বৈচিত্র্যের বিচারে এই শিল্প কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে এক চিত্তাকর্ষক চেহারা নিয়েছে। মানুষের রুচি, ব্যাবহারের ধরন, এবং চাদিহার খাপ খেতে পৃথিবীতে নিঃশব্দে ঘটে গেছে এক পাদুকা বিপ্লব। ধীরে ধীরে পাল্টে গেছে জুতার ধারণা। একসময় যা ছিল শুধু মাত্র আভিজাত্যের প্রতীক, আজ তা আমআদমির। জুতারবা মানুষের প্রথম ‘পা-জামা’র ইতিহাস তাই আসলে পাদূকা-পূরাণের কিছু চমকপ্রদ পরম্পরা।

জুতার আবিষ্কার ও বিবর্তনঃ 

জুতার আবিষ্কার হয় প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে! কিন্তু শুরুতেই আপনাদের একটা চমকে যাওয়ার মতো খবর দিই, ডান ও বাঁ পায়ের আলাদা জুতা তৈরির ইতিহাস খুব বেশী প্রাচীন নয়। মাত্র হাজার দেড়েক বছর আগে দুই পায়ের জন্য আলাদা আলাদা জুতা তৈরি হতে শুরু করে। ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ধরে সিংহভাগ মানুষ জুতা পরতেন না। তাই একেবারে আধুনিক যুগের আগে পর্যন্ত পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার বৃহৎ অংশেরই জুতার প্রয়োজন হত না। তবে জুতার ব্যবহার চলে আসছে কিন্তু সেই আদিযুগ থেকে।

জুতার ইতিহাস ও বিবর্তন

জুতা। ইমেজ সোর্স – সংগ্রহিত

যদিও ঠিক কবে থেকে মানুষ জুতা পরছেন এই নিয়ে বিতর্ক আছে। সাম্প্রতিক কালের একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে কেউ কেউ অনুমান করছেন যে আনুমানিক ৪০ হাজার বছর আগের পুরনো প্রস্তরযুগে জুতারউদ্ভব হয়। তবে তখন সবাই নিয়মিত জুতা পরতো এমনও নয়। আরও বেশ কিছু পরে মধ্যপ্রস্তর যুগ পেরিয়ে মানুষ নাকি জুতা পরাতে অভ্যস্ত হয়। প্রাচীনতম জুতারযে নমুনা পাওয়া গেছে তা ছিল নরম চামড়ায় তৈরি ও পায়ের চারপাশে মোড়ানো। অনেকটা স্যান্ডাল গোছের ব্যাপার।

বিবর্তনে জুতাঃ 

এখনও পর্যন্ত পাওয়া প্রাচীনতম জুতোটির বয়স প্রায় ১০ হাজার বছর অর্থাৎ কৃষি আবিষ্কারের সময়। অবশ্য নৃবিজ্ঞানী এরিক ট্রিঙ্কোসের বক্তব্য, তার কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই জুতা পরার প্রচলন শুরু হয়। ২০০৫ সালে প্রকাশিত ট্রিঙ্কোসের গবেষণাপত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ৪০ হাজার বছর আগে মানুষের পায়ের এবং শরীরের হাড়ের গঠনে যে সব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে তার পিছনে ছিল জুতারঅবদান। তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তনগুলি নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো স্যাপিয়েন্স- এই দুই প্রজাতির মধ্যেই ঘটেছিল। এরিক তাঁর গবেষণায় আরও জানিয়েছেন, এই সময় থেকেই মানুষের পায়ের পাতা উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হতে শুরু করলেও পায়ের হাড় যথেষ্ট বড়ই ছিল। এই রকম তথ্য থেকে এই এরিক সিদ্ধান্তে আসেন যে, পায়ের বিবর্তনের পেছনে ছিল জুতার ব্যবহার। শরীরের অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে মানুষের পায়ের হাড়ের সংখ্যা বেশি। হাজার হাজার বছর ধরে ভূমি ও আবহাওয়াগত পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিবর্তনের ইতিহাস লেখা হয়েছে। সে ইতিহাসে মানুষের পায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর পায়ের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে জুতারঅবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক। যে সব নৃতত্ত্ববিদ এরিকের এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের বক্তব্য হল, পায়ের পাতার গড়নের পরিবর্তন জুতা থেকে নয়, সম্ভবত শ্রম বিভাজনের ফলে ঘটে থাকবে। সে ক্ষেত্রে যদি এরিকের গবেষণা ভুল হয়েও থাকে, তা হলে জুতা আবিষ্কারের সময়কাল দাঁড়ায় ১০ হাজার বছর। তবে এটা ঠিক, আদি মানবের জুতারসঙ্গে আধুনিক জুতারকোনও মিল নেই।

পাদুকা-পুরাণ

আরও কয়েক হাজার বছর এগিয়ে ইউরোপে আধুনিক জুতারখোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, পুরুষ ও মহিলাদের জুতারমধ্যে তখন তেমন ফারাক ছিল না। তবে সামাজিক শ্রেণীর বিচারে জুতারফ্যাশান ও উপাদানে পার্থক্য ছিল। সাধারণ মানুষের জুতারভেতরে থাকত মোটা ও কালো চামড়ার হিল। অন্যদিকে অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা যে জুতা পরতেন তার হিল হত কাঠে তৈরি। ভারতবর্ষে এ পরিধেয় বস্তুটির ব্যবহার প্রাচীনকালেই শুরু হয়েছিল। রামায়ণ তো আসলে পাদুকা-পুরাণের ব্যাপার। রামের অনুপস্থিতিতে ভরত যে দাদার পাদুকা-যুগল সিংহাসনে রেখেই রাজ্য পরিচালনা শুরু করেছিলেন, তা আমাদের অজানা নয়। কালিদাসের ‘কাদম্বরী’ গ্রন্থে সন্ন্যাসীদের নারকেলের ছোবড়ায় তৈরি পাদুকা ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

অবশ্য পূর্ণাঙ্গ অবয়ব দেখা যায় স্পেনের পুরনো গুহায় ১৫ হাজার বছর আগের আঁকা কিছু ছবিতে দেখা যায়।অবশ্য আদিম মানুষদের পায়ে পশুর চামড়া জড়ানোর রেওয়াজ ছিল। ৫ হাজার বছর আগে হিমযুগের মানুষরাও নাকি খড়যুক্ত চামড়ায় মোড়া জুতা পরত। স্যান্ডেলের প্রথম ব্যবহার শুরু করে মিশর। সেখানকার ফারাওরা স্যান্ডেল পরে রাজকার্য সামলাতেন।

ইউরোপের রাজাদের মতোই ফারাও ছাড়া মিশরে অন্য কারও জুতা পরার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিছু গবেষকের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৫,৫০০ অব্দে পূর্ণাঙ্গ জুতা তৈরি হয়। গবেষকদের অনুমান, বিশ্বের প্রথম জুতা তৈরি হয় মধ্যপ্রাচ্যের ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকায়। পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য প্রথম জুতা তৈরি হয়েছিল। আর্মেনিয়ার এরিনিয়া ১ নামের বিখ্যাত গুহায় পূর্ণাঙ্গ জুতারসন্ধান মিলেছে। তবে এ নিয়ে বিতর্ক আছে।

কাঠের জুতাঃ  

১৩০০ থেকে ১৬০০ শতক পর্যন্ত লেবানিজরা একধরনের কাঠের জুতা ব্যবহার করতেন, যার নাম ছিল ‘কাবকাবস’। মধ্যযুগে ব্যবহৃত জুতা দেখে নাকি এই জুতারনকশা বানানো হয়েছিল। ১৪০০ শতকের শেষদিকে ইতালিতেও কাঠ দিয়ে এক রকমের ছোট জুতা তৈরি হত, নাম ছিল ‘চোপিনস’। মূলত মহিলাদের ব্যবহারেই জন্য তৈরি হওয়া এই জুতা ৫ ইঞ্চি মাপের হতো। ভারতে ১৭০০ শতকের দিকে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল কাঠের খড়ম। উনিশ শতকের দিকে ফ্রান্সে একবার কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল বিয়ের জুতা। প্রাচীন আফ্রিকার মরিসাসের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের ব্যবহৃত জুতা দেখে ফরাসিরা নবম শতকের দিকে এই জুতারহদিশ পায়। এছাড়া জল, কাদা ও বরফে ঢাকা পথ পাড়ি দিতে ফিনল্যান্ডে গাছের ছাল দিয়ে তৈরি হত আর এক ধরনের জুতো। ১৮০০ শতকের দিকে জাপানি মেয়েরা ‘ওকোবো’ নামে এক ধরনের জুতা পরতেন। সেও ছিল কাঠে তৈরি।

এশিয়া মহাদেশেও ব্যাপক হারে কাঠের জুতারপ্রচলন ছিল। ১৭০০ শতকে কাঠের তৈরি খড়ম ভারতীয় উপমহাদেশে ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। হিন্দি ‘খড়ৌঙ’ থেকে বাংলায় ‘খড়ম’ শব্দটির উৎপত্তি। সংস্কৃতে খড়মকে ‘পাদুকা’ বলে। হিন্দুধর্মে খড়মের ব্যবহার সুপ্রচলিত। তাছাড়া খড়মের এক আলাদা গুরুত্বও আছে। হিন্দুধর্মের পাশাপাশি জৈনধর্মেও ভিক্ষাজীবী সন্ন্যাসী ও সাধুসন্তেরা খড়ম ব্যবহার করে থাকেন। এক টুকরো কাঠকে পায়ের মাপে কেটে খড়ম তৈরি করা হয়। কাঠটির সামনে একটি বর্তুলাকার কাঠের গুটি বসিয়ে দেওয়া হয়। এই গুটিটিকে বুড়ো আঙুল ও তার পাশের আঙ্গুলটি দিয়ে আঁকড়ে ধরা হয়। ইদানিং পা আটকে রাখার জন্য অবশ্য কাঠের গুটির পরিবর্তে রাবার খণ্ড ব্যবহার করা হচ্ছে।

জুতার ইতিহাস ও বিবর্তন

মডেল – নিপু। ইমেজ সোর্স – kalerkontho.com

জুতা তুমি কার?

ইউরোপে কিছু কিছু অঞ্চলে শুধু রাজারাই জুতা পরতেন। রাজতন্ত্রে জুতা ছিল বনেদিয়ানা আর বিত্তের পরিচায়ক। কোনও প্রজার জুতা পরা রাজারা পছন্দ করতেন না। জুতা পরিহিত প্রজার খোঁজ পাওয়া গেলে তাঁকে মৃত্যদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হত। ইংল্যান্ডে জুতা তৈরির ক্ষেত্রে আইনও তৈরি করা হয়। রানী এলিজাবেথের তৈরি এই আইনে এইরকম ফতোয়া দেওয়া ছিল যে, জুতা শুধু রাজপরিবারের জন্যেই তৈরি হবে। পরবর্তীকালে সেই আইন শিথিল হলেও এমন এক মাপের জুতা তৈরির অনুমতি দেওয়া হয় যে তাতে সাধারণ মানুষের কাছে জুতা অধরাই থেকে যায়।

হাই হিলঃ 

জুতারমধ্যে হিল ব্যবহারের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ।

ইজিপ্টে – খ্রীষ্টপূর্ব ৩,৫০০ অব্দে আঁকা ইজিপশিয়ান ম্যুরালে উঁচু হিলের দেখা পাওয়া যায়। নিম্নশ্রেণীর মানুষদের থেকে নিজেদেরকে আলাদা দেখাতে রাজা ও উচ্চবর্ণের মানুষেরা হিল জুতা পড়তেন। আর সাধারণ মানুষেরা থাকতেন খালি পায়ে। মূলত উত্সব-অনুষ্ঠানে হিল তোলা জুতা ব্যবহৃত হত। পুরুষ ও মহিলা উভয়েই হিল তোলা জুতা পরতেন। পরবর্তীকালে অবশ্য ইজিপ্টের কসাই বা মাংস বিক্রেতারাও হাই হিল জুতা পরতে শুরু করেন। এই জুতা পায়ে দিয়ে পশুর রক্ত-মাংসের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে তাঁদের সুবিধে হত।

ফ্রান্সে – হিলওয়ালা জুতারআধুনিকীকরণ ও প্রচলন শুরু হয় ফ্রান্সে। ষোড়শ লুই প্রথম হিল তোলা জুতা পড়তে শুরু করেন। রাজার যেমন মর্জি হয়ে থাকে। তিনি ঠিক করলেন, তিনি যে জুতা পড়বেন অন্য কেউ তা পরতে পারবে না। জনসাধারণের ওপরে তাই এই ধরনের জুতা ব্যহারে নিষেধাজ্ঞা চালু হল। চতুর্দশ লুই-এর উচ্চতা ছিল মাত্র ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। নিজেকে লম্বা দেখাতে আরও পরে তিনি হিল জুতারবহুল প্রচলন করেন। শুধু তা-ই নয়, ষোড়শ লুইয়ের বিপ্রতীপে হেঁটে তিনি পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ধরনের জুতা পরাকে বাধ্যতামূলক করেন। হাইহিল জুতারব্যবহার নিয়ে ফ্রান্সে নাকি গুটিকয়েক ছোট যুদ্ধও হয়েছিল। আর তাতে বেশ কিছু মানুষ মারাও যান।

ইউরোপে – পরবর্তীকালে লন্ডনের কিছু ব্যবসায়ী ফ্রান্সের হিল তোলা জুতারঅনুকরণে জুতা তৈরি করতে শুরু করেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই রাজপরিবারের সদস্যদের মনে হিল জুতা জায়গা করে নেয়। ফ্রান্সের মতোই জনসাধারণের জন্য তা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ষোল শতকের ইউরোপে অভিজাত মহিলাদের ব্যবহৃত কিছু জুতারহিল এতটাই উঁচু ছিল যে হাঁটার সময় তাঁদের সাহায্য করার জন্য সঙ্গে চাকর নিতে হত। এর পর থেকে লম্বা পা-ওয়ালা জুতা (রেভ শু) তৈরি হতে শুরু করে এবং ভেনিসে তা প্রবল জনপ্রিয়তা পায়। তখন মূলত বারবণিতারা এই ধরনের জুতা পরতেন। তত্কালীন রেভ শু-র হিলের উচ্চতা এতটাই হাস্যকর ও একই সঙ্গে এমন বিপজ্জনক ছিল যে মহিলাদের জুতারহিলের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন করা হয়। আসলে তখন চলতে-ফিরতে মহিলাদের উল্টে পড়ে হাত-পা ভাঙার ঘটনা আকছার ঘটছিল।

১০ ইঞ্চি হিলঃ

জুতোতে হিল লাগানোর স্টাইল আজও বিদ্যমান। ২০১০ সালে ফ্যাশন ডিজাইনার আলেকজান্ডার ম্যাকক্যুইন একটি ১০ ইঞ্চি উঁচু হিলের জুতা (আর্মাডিলো হিল) বানিয়েছিলেন। বিপদ এড়াতে মডেলরা অবশ্য ফ্যাশন প্যারেডে সেই জুতা পরতে অস্বীকার করেন।

জুতা নিয়ে ব্যবসাঃ

পাদুকার প্রথম আধুনিকীকরণ ঘটে ইউরোপীয়দের হাতে। জুতা তৈরির সেলাই মেশিনের উদ্ভাবন হয় ১৮৪৬ সালে শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে। ওই সময়েই চামড়া কাটাই করার মেশিনও তৈরি হয়। ইউরোপের জুতারইতিহাসে ১৮৫০ সাল খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই বছর থেকে জুতা আমদানী ও রপ্তানীর দ্বার খুলে যায়। তার আগে এই নিয়মে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তার পাঁচ বছর আগে থেকেই অবশ্য ইংল্যান্ডের সরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জুতা তৈরির কারখানা স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল। এলিস হাও-এর জুতা তৈরির যন্ত্রের পরে ১৮৫৮ সালে লেম্যান আর ব্লেক নামে অন্য একজন ব্রিটিশ জুতা বানানোর আধুনিক যন্ত্র তৈরি করেন। পরবর্তী কালে গর্ডন ম্যাককে লেম্যানের যন্ত্রের পেটেন্ট কিনে নেন।

গর্ডন প্রতিষ্ঠিত জুতা কোম্পানিটিই যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধে সেনাবাহিনীর জুতা তৈরি করত। যুদ্ধ পরবর্তীকালে এই কোম্পানিটি জনসাধারণের জন্য জুতা তৈরি করতে শুরু করে। যা-ই হোক, আইন প্রণয়ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইংল্যান্ড থেকে বিখ্যাত ‘অক্সফোর্ড শু’ কোম্পানির জুতা রপ্তানী হতে শুরু করে। জার্মানিও ১৪৯০ সালে তৈরি করা জুতারঅদলবদল করে ইউরোপের বাজার মাতাতে চলে আসে। পিছিয়ে ছিল না আমেরিকাও। ধীরে ধীরে সেখানকার জুতারব্র্যান্ড ‘মোকাসিন’ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এই জুতা আদতে উত্তর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানরা পরতেন। চরম ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য তাঁরা যে জুতা পরতেন তার নাম ছিল ‘মোকাসিন’। সেই জুতা আবার বিভিন্ন রঙে আঁকা হত।

মহিলাদের জুতাঃ 

আগেই বলেছি, ১৮০০ সালের আগে ইউরোপের মহিলা ও পুরুষ একই ধরনের জুতা পরতেন। জুতারডিজাইন বা দৈর্ঘ্য ছিল একইরকম। তার পর থেকে মহিলাদের জন্য জুতারওপরের অংশে চামড়ার বদলে সিল্কের কাপড়ের ব্যবহার শুরু হয়। জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও বেলজিয়ামে দেদার সিল্কের জুতা তৈরি হতে থাকে।

বেলজিয়ামের তৈরি জুতোতে সিল্কের উপর নকশাও করা হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জুতা শিল্পে আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। পুরুষদের জুতারধরন মোটামুটি একই রকমের থাকলেও এই সময় থেকেই মহিলাদের জুতোতে নাটকীয় বিবর্তন শুরু হয়।

জুতার ইতিহাস ও বিবর্তন

জুতা। ছবি- সংগ্রহিত

খালি পায়ের ভারত উপমহাদেশঃ

বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারত উপমহাদেশের পাহাড়ি এলাকায়, বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষ প্রবল ঠাণ্ডা ও জল থেকে পা বাঁচাতে জুতা পরতে বাধ্য হতেন। তবে যেহেতু ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলের আবহাওয়া সাধারণভাবে উষ্ণ, তাই আম ভারতীয়ের কাছে জুতারখুব প্রয়োজন ছিল না। তাঁরা খালি পায়ে থাকতেই পছন্দ করতেন। 

এই খালি পায়ে থাকাটাই ভারত উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় ভিন্ন করে তুলেছে। অগ্রজদের পায়ের ধুলো নেওয়া, পা ছুঁয়ে প্রণাম কিংবা সালাম করা বিশ্বের অন্য সংস্কৃতির চেয়ে স্বতন্ত্র বিচিত্র দিয়েছে! এখানকার মায়েরা তাদের শিশুদের পায়ের পাতা ম্যাসাজ করে দেন,  শিক্ষাগুরুর পা ধুয়ে দেওয়া হয়,ছোটরা অগ্রজদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে থাকে, দেবতার ‘চরণামৃত’ মনে করে কোন ধর্মিয় পন্ডিতের পা-ধোওয়া পানি খাওয়ার মত ঘটনা ঘটে,অপরাধ করে কেউ পায়ে ধরে ক্ষমা চায়, এসব দেখে কোন বিদ্যাপতি লিখে ফেলেন ‘দেহি পদপল্লবমুদারম’,আর তাই পাঠক আপনি হয়ত জেনে থাকবেন, আমাদের দেশের অন্যতম সংস্কৃতি হল পায়ে গয়না পরা, পায়ে আলতা কিংবা মেহেন্দি পরা ।

পরিশেষ এ বলি,জুতা বা জুতারউদ্ভাবন হয়েছিল মূলত মানুষের পা এর নিরাপত্তা বিধানের জন্যে, তবে এখন তা কেবল নিরাপত্তাই যোগায় না, বরং এটি সজ্জারও একটি অংশ। মানুষের পায়ে শরীরের অন্য যে কোন জায়গার তুলনায় অধিক হাড় আছে পায়ে। আর পায়ের  আছে বহু শত সহস্র বছরের বৈরী ভূমি ও আবহাওয়ায়  বিবর্তনের ইতিহাস। পা এর সাথে ইন্দ্রিয় – এর সমন্ময়ের ফলেই আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং হাঁটা সম্ভবপর হয়। 

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: