1. sjranabd1@gmail.com : S Jewel : S Jewel
  2. solaimanjewel@hotmail.com : kalakkhor :
কিউবার বিপ্লবের ইতিহাস (শেষ পর্ব) - কালাক্ষর
বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন

কিউবার বিপ্লবের ইতিহাস (শেষ পর্ব)

  • Update Time : রবিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২১
চে গুয়েভারা
চে গুয়েভারা

কালাক্ষর ডেক্সঃ কিউবার বিপ্লব নিয়ে দুই পর্বের ধারাবাহিক লেখার আজ যাবনিকা টানছি, কিউবার বিপ্লব নিয়ে লেখা এই অংশটি পড়ার আগে অনুরোধ করবো কিউবান বিপ্লবের ইতিহাস (১ম পর্ব)  টি পড়ে আসার জন্য। তা হলে পরো বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। 

মার্কিন তাবেদার বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে কিউবার সাধারণ মানুষের চাপা ক্ষোভ জমতে থাকে। মাঝে কোন বিষয় নিয়ে বাস্তিতা বিরোধী ক্ষোভ বিদ্রহের পথে চলে যায় এই ভয়ে বাস্তিস্তা সরকারের চলে ধারাবাহিক স্টিং অপারেশান, কিউবার আর্থ সামাজিক অবস্থার কথা কেউ বললে তাকে খুব দ্রুততার সাথে তুলে নিয়ে যেত বাস্তিস্তার পুলিশ বাহীনী, সর্ব ক্ষেত্রে চলে বাস্তিস্তা সরকারের দমন নিপীড়ন,কিউবার এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ে যখন সেদেশের পুনর্জাগরণের আলো নিমিষেই অস্তমিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই ভোরের সূর্যের মতোই উদিত হন বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো। তার সাংগঠনিক দূরদর্শিতা এবং বিপ্লবী মনোভাব যা পরবর্তীতে কিউবা বিপ্লবকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়।

ঠিক সেই সময়টিতেই বিপ্লবের মঞ্চে আবির্ভুত হন চে গেভারা, রামিরো ভালদেস, রাউল কাস্ত্রো ও হুয়ান আইমেদা সহ আরও অনেকেই। ফলে কিউবা বিপ্লবের সূচনালগ্নের ভয়াল মুহূর্তে ফিদেল ক্যাস্টো পেয়ে যান তার বিপ্লব সফল করার কান্ডারীদের ।

ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন পেশায় একজন উকিল। ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনীতিতে হাত খড়ি হয় ছাত্র জীবনেই। পরবর্তীতে তিনি মার্ক্সবাদী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে রাজনীতি করতে থাকেন। যখন বাতিস্তা সরকার কিউবার ক্ষমতায় আসল তখন তিনি দেখলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে সম্রাজ্যবাদ বিস্তার করছে। একই সাথে কিউবার সাধারণ কৃষক-শ্রমিক নানাভাবে বঞ্চিত ও শুষিত হচ্ছে। ফলে তিনি বাতিস্তা সরকার কে কিউবা থেকে উৎখাত করে সেখানে সাধারণ জনসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রত গ্রহণ করেন। এর জন্য তিনি ১৯৫৩ সালে প্রথমে ১৫০০ সদস্য নিয়ে একটি বিপ্লবী সঙ্ঘ গড়ে তোলেন। এই সঙ্ঘের অধিকাংশ সদস্য ছিল বাতিস্তার আমলে সেনা বাহিনী হতে পদচ্যুত সেনা কর্মকর্তা। এ সময় কাস্ত্রোর সাথে পরিচয় হয় বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী চে গেভারার।

কিউবান রেভুলেশান

কিউবান রেভুলেশান

তিনিও কাস্ত্রোর সাথে বিপ্লবে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালের ২৬ শে জুলাই সান্টিয়াগো শহরের মনকাদা ব্যারাক ও বেয়ামো সেনা ক্যাম্প আক্রমণ করেন। মূলত বাতিস্তা সেনা দলের সাথে কোনো সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কোনো লক্ষ্য কাস্ত্রোর ছিলনা। তিনি চেয়েছিলেন- সেনা ক্যাম্প থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে অস্ত্র লুণ্ঠন করতে এবং বেতারের মাধ্যমে আক্রমণের বার্তা ঘোষণা করে শহরবাসীকে একটি অভ্যুত্থানের প্রতি ধাবিত করতে।

কিন্তু তিনি তা করতে ব্যর্থ হোন। সাথে তার বাহিনীর বেশ কজন সৈনিক প্রাণ হারান। কিন্তু কাস্ত্রো তার কিছু সহচর নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় না হওয়ার দরুন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ও তার কয়েকজন সহকারী পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান। কিউবার আদালত রাষ্ট্র দ্রোহিতার অভিযোগ এনে কাস্ত্রোকে ১৫ বছরের কারা দণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু ১৯৫৫ সালে বাতিস্তা সর্বোচ্চ ক্ষমতাবলে কাস্ত্রোকে মুক্তি প্রদান করেন এবং তাকে মেক্সিকোতে চলে যেতে বাধ্য করেন।

কাস্ত্রো মেক্সিকোতে থাকা কালেই কিউবা বিপ্লবের রসদ সংগ্রহ করেন। সেখানে থেকেই কিউবা থেকে বিতাড়িত ও বিপ্লবী নানা জোটের সৈনিকদের একত্রিত করে মেক্সিকোতেই একটি শক্তিশালী বিপ্লবী ব্রিগেড গড়ে তোলেন। সেখানে পরবর্তীতে তার সাথে মিলিত হয় তার ভাই রাউল কাস্ত্রো ও গেভারা। তারা সম্মিলিত ভাবে বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে বিপ্লব কামী শত শত যুবক এসে এই বিপ্লবী ব্রিগেডে যোগ দিতে থাকে। ফলে এই ব্রিগেড ক্রমে শক্তিশালী হতে থাকে।

সবশেষ ১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর গ্রানামা নামক জাহাজে করে কিছু বিপ্লবীকে সাথে নিয়ে কাস্ত্রো কিউবার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।কিন্তু যাত্রা শুরু করার মাত্র ৭দিনের মাথায় প্রতিকুল আবহাওয়া ও কিছু সৈনিকের অসুস্থতা জনিত কারণে পার্শ্ববর্তী বন্দরে জাহাজ নোঙর করতে হয়। জাহাজ নোঙর করার সাথে সাথেই স্থানীয় কোস্টগার্ড সংবাদ পেয়ে যায়। তারা এই সংবাদ পৌছে দেন সেনাবাহিনীর কানে। ফলে সেনা বাহিনী এসে কাস্ত্রোর বাহিনীর উপর আক্রমন করে বসে। কাস্ত্রো ও তার বাহিনী সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সেখানে অধিকাংশ সৈনিকই হতাহত হোন। তবে কাস্ত্রো ২২ জন সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে তিনি সিয়েরা মায়েস্ত্রা নামক একটি পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

সিয়েরা মায়েস্ত্রা মুলত ছিল আখ চাষের জন্য বিখ্যাত একটি অঞ্চল। ফলে সেখানকার অধিকাংশ জনগণ ছিল কৃষক-শ্রমিক। কাস্ত্রো এখানকার কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা জাগিয়ে তোলেন। এখানকার কৃষক-শ্রমিকরা নানাভাবে শোষন বঞ্চনার শিকার হত। ফলে এখানকার স্থানীয়দের মধ্যেও সরকার বিরোধী চাপা উত্তেজনা ছিল। কাস্ত্রো এটিকে কাজে লাগিয়ে এখানকার জনসাধারণকে বিপ্লবী করে তোলে। তাছাড়া কাস্ত্রো অল্পদিনের মধ্যেই এই অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

এই খবর বাতিস্তা সরকারের কানে গেলে সেনা বাহিনী কাস্ত্রো ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চল হওয়ার কারণে কাস্ত্রো ও তার বাহিনীর কোন ক্ষতিই করতে পারেনি। তাছাড়া স্থানীয়দের সমর্থন ও সহায়তা ছিল অত্যধিক। যার ফলে বাতিস্তা বাহিনী কাস্ত্রোর কোন হদিসই বের করতে পারেনি। সময়ের সাথে কাস্ত্রোর সাথে যোগ দিতে থাকে কিউবার নানা প্রান্ত থেকে আসা বাম সংগঠন সমূহ।

ফলে কাস্ত্রোর নির্দেশে সকল বিপ্লবী এখানে এসে জড় হতে থাকে। একই সাথে তাদের জন্য প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। আর এইসব কিছু করার জন্য কাস্ত্রো কে যে সবচাইতে বেশি সাহায্য করেছেন তিনি হলেন চে গেভারা। ফলে এই অঞ্চলে বিপ্লবীদের অবস্থান শক্তিশালী হতে থাকে। ফলে তারা এই অঞ্চল থেকেই গেরিলা আক্রমন চালানো শুরু করে।

এভাবে গেরিলা আক্রমন চালিয়ে সিয়েরা তে বাতিস্তা বাহিনী কে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলা হয়। একের পর এক সরকারি বাহিনীর ঘাঁটিতে আক্রমন করে তাদের গুড়িয়ে দিতে থাকে। তবে কখনো কখনো পাল্টা আক্রমণেরও সমুক্ষিন হতে হত। তবে অধিকাংশ সময় কাস্ত্রো বাহিনীই সুবিধা জনক অবস্থানে থাকতো। কেননা দুর্গম অঞ্চল হওয়ার জন্য সরকারি বাহিনী বিপ্লবীদের তেমন কিছুই করতে পারতো না। সরকারি বাহিনীর উপস্থিতি টের পেলেই বিপ্লবীরা নিরাপদ অবস্থানে চলে যেত। এভাবে ধীরে ধীরে বিপ্লব পুঞ্জীভূত হয়ে শক্তিশালী হতে থাকে। এর চুড়ান্ত মাত্রা লাভ করে ১৯৫৮ সালে।

১৯৫৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কিউবার রাজধানী হাভানা দখল করার জন্য এবং বাতিস্তা কে উৎখাত করার জন্য এক বিপ্লব ঘটিয়ে দেন। কাস্ত্রো তার সকল বিপ্লবীদের নিয়ে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলে বাতিস্তা বাহিনী তাদের বাধা প্রদানের চেষ্টা করলেও। বিপ্লবীদের অসীম সাহস ও আগ্রাসি নীতির কাছে বাতিস্তা বাহিনী সহজেই পরাস্ত হয়ে পড়ে। এই খবর যখন প্রেসিডেন্ট বাতিস্তা শুনতে পান তখন তিনি হাভানার সিংহাসন ছেড়ে মেক্সিকোতে পলায়ন করে। এটি ছিল ১৯৫৮ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। ফলে এর ঠিক পরের দিন ১লা জানুয়ারি ১৯৫৯ সালে একটি নতুন দিনের ন্যায় কাস্ত্রো নতুন শাসক হিসেবে কিউবার শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে তুলে নেন। 

ক্ষমতা গ্রহণ করার পর পর তিনি সকল প্রকার নির্বাচন নিষিদ্ধ করে দেন। ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে মার্ক্সবাদকে গ্রহণ করেন এবং মার্ক্সবাদী আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। সম্পদের মধ্যে ব্যক্তিগত অধিকারকে বিলুপ্ত করে তদস্থলে রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করেন।১৯৬০ সালের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরমধ্যদিয়েই এগিয়ে কিউবায় সমাজতন্ত্রের যাত্রা চলতে থাকে। ৯০ এর দশকে এসে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের ভাঙ্গন শুরু হলেও কিউবায় বুক উঁচিয়ে সমাজতন্ত্র চলতে থাকে। কিউবা বিপ্লব শুধু একটি বিপ্লবই নয়, যেনো সমাজের পুঁজিপতি শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমজীবী গণ-মানুষের হুংকার। ইতিহাস তার নিজ গতিতে চললেও, কিউবা বিপ্লব রয়ে যাবে তার নিজস্ব স্থানে, নিজস্ব মহিমাতে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
©2021 All rights reserved © kalakkhor.com
Customized By BlogTheme
error: Content is protected !!