Site icon কালাক্ষর

অশ্বত্থামাঃ মহাভারতের যে অভিশপ্ত বীরের কাহিনী

অশ্বত্থামাঃ মহাভারতের যে অভিশপ্ত বীরের কাহিনী

ভারতীয় উপমহাদেশের আদি সনাতন ধর্মীয় সাহিত্য গুলো গ্রীক সাহিত্যের মত বিখ্যাত না হলেও সারা বিশ্বে ব্যপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে একথা নির্দিধায় বলা যায়। এছাড়া বিশ্বের বিখ্যাত সব মহাকাব্যর মধ্যে “মহাভারত” অন্যতম একটা মহাকাব্য হিসেবে চর্চিত। বিশেষ করে কাব্যের অভ্যন্তরীণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বীররসের জন্য। যখনই কেউ “মহাভারত” কাব্যের কথা বললে আমাদের কল্পনায় দৃশ্যমান হয় শৌর্য-বীর্জে শক্তিশালী কতগুলো চরিত্র। যারা ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকেই আলোচিত। আবার বিতর্কিত চরিত্রও রয়েছে। সেই বিতর্কিত চরিত্র গুলোর মধ্যে অন্যতম হলেন, অশ্বত্থামা চরিত্রটি। অশ্বত্থামা ছিলে রাজগুরু দ্রোনের পুত্র। স্বয়ং মহাদেবের কাছ থেকে নাকি অমরত্বের বর পেয়েছিলেন এই অশ্বত্থামা। ভারতীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাকে শুধু সাহিত্যিক চরিত্র হিসেবে দেখেন না, বরং তাদের অনেকের বিশ্বাস অশ্বত্থামা আজও বেচে আছেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী ভারতেই ঘটে যাওয়া কয়েকটা ঘটনা জেনে আসি-

অশ্বত্থামাকে নিয়ে ঘটনা ১ঃ আজ থেকে কয়েক বছর আগে ভারতের মধ্য প্রদেশের এক আয়ুর্বেদ ডাক্তারের ঘটনা এটা। একদিন তার চেম্বারে একজন অদ্ভুত রুগী এলেন। কপালে তার অস্বাভাবিক এক ক্ষত। ডাক্তারটির দাবি, তিনি তার জানামতে যতো উপযুক্ত ওষুধ আছে সব প্রয়োগ করেছিলেন ঐ ক্ষতে। সেলাই করে জুড়েও দিতে চেয়েছিলেন এরপর। কিন্তু রুগীটার কপালের ঐ ক্ষত কোনভাবেই সারছিলো না৷ তাই কৌতুকের উদ্দেশ্যেই ডাক্তার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি অশ্বত্থামা নাকি?’ ব্যস এটুকুই। তারপরের ঘটনা মনে পড়লে ডাক্তার সাহেব এখনও ভয় পান। তিনি যখন প্রশ্নটা করেই ঘুরে তাকালেন, দেখলেন রুগীটা তার কেবিনে নেই আর। এমনকি জিজ্ঞেস করে জানা গেলো কেবিনের বাইরের কেউই ঐ রুগীকে বেরিয়ে যেতে দেখেনি। ডাক্তারটি আরও বলেছিলেন রুগীটার কপালের সেই ক্ষত এত ভয়ংকর ছিলো দেখতে যে, ‘তার মগজ যেন কেউ মাথার ক্ষতটা দিয়ে টেনে বের করেছে!’

অশ্বত্থামাকে নিয়ে ঘটনা ২ঃ ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাইলট বাবা। তিনি দাবি করেছিলেন, হিমালয়ের পাদদেশে একবার অশ্বত্থামার দেখা পেয়েছিলেন তিনি। তার ভাষ্যমতে অভিশপ্ত বীর লোকটা এখন হিমালয়ের উপজাতিদের সাথে বসবাস করেন। এমনকি শিবের এক মন্দিরে এখনো রোজ প্রার্থনা সমেত অর্ঘ্য দেন।

অশ্বত্থামাকে নিয়ে ঘটনা ৩ঃ ভারতের মধ্যপ্রদেশের অসিগড়ের পুরোনো কেল্লার পাশে বাস করা গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন, অশ্বত্থামা প্রতি সকালে আসেন ওখানে। পুরোনো কেল্লার ভেতরে থাকা শিবলিঙ্গে অর্ঘ্য দেন তখন তিনি। প্রার্থনা করেন প্রিয় দেবতার কাছে।

আপনি হয়ত জানেন না অতিতে এই ভাবে পৃথ্বীরাজ চৌহান, সাধু নারানাপ্পা-সহ আরও অনেকের সাথে অশ্বত্থামার দেখা হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। যে ঘটনাগুলো একটার সাথে অন্যটার সময়ের দূরত্ব কখনও শত শত বছর। আশ্চর্য ব্যাপার, তাই না? নিছক গাল গল্প মনে হতেই পারে তবে এর সপক্ষেও অনেকেই ভাবেন। তাই বিশ্বাস করেন আর না করেন তা আমার আজকের পুরা লেখাটা পরার পর হয়ত আপনাদের ধারণা পাল্টাতেও পারে!

অশ্বত্থামার পরিচয়

অশ্বত্থামা – মহাভারত এর অন্যতম চরিত্র। মহাবীর অশ্বত্থামা আপনার মহাভারতের অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র গুরু দ্রোণাচার্যের পুত্র ও সাত চিরঞ্জীবীদের একজন ছিলেন এই অশ্বত্থামা। স্বয়ং দেবতা শিব নিজে তাকে অমরত্বের বর দিয়েছিলেন।  দেবতা শিব এর দেওয়া এই অমরত্বের বর-ই একসময় অশ্বত্থামার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দেবতা কৃষ্ণ দেবতা কৃষ্ণ তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন অশ্বত্থামা সারাজীবন দুঃখ দুর্দশা ভোগ করবে। অভিশাপ দিয়েছিলেন এক ভয়ংকর অভিশপ্ত জীবনের। যে জীবন থেকে মুক্তি নেই কোন। মৃত্যু কামনা করবেন তখন অশ্বত্থামা। কিন্তু মৃত্যু আসবে না তার জন্য। বেঁচে থাকবেন তিনি অনন্তকাল। ধুঁকে ধুঁকে। সীমাহীন কষ্ট শরীরে নিয়ে।

 অশ্বত্থামার যুদ্ধ শিক্ষা :

অশ্বত্থামার পিতা গুরু দ্রোণ ছিলেন একজন ব্রাক্ষ্মণ। ব্রাক্ষ্মণ হয়েও তিনি ক্ষত্রিয়ের মতো যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি তার যুদ্ধ শিক্ষা শেখেন তার পিতা ভরদ্দাজ মুণির কাছ থেকে। তার তার পিতার দেওয়া শিক্ষাই তিনি তার ছাত্রদের শেখাতেন। একবার তার বাল্যকালের মিত্র রাজা দ্রুপদের কাছে গেলে তিনি গুরু দ্রোণকে অপমান করেন। আর সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে তিনি হস্তিনাপুরে এসে তার যোগ্য শিষ্য খুঁজতে থাকেন। সেখানে তিনি কৌরব কুমারদের সাথে তার একমাত্র ছেলে অশ্বত্থামাকে যুদ্ধ শিক্ষা দিতেন। গুরু দ্রোন দেখতে পেলেন সেখানে ধনু বিদ্যাতে অর্জুনের বিশেষ দক্ষতা অর্জন করছে, তাই তিনি তার ছেলে অশ্বত্থামাকে সেরা ধনুর্বি‌দ হবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন। অশ্বত্থামা বহু গুপ্ত অস্ত্র প্রয়োগের কৌশল পিতার কাছ থেকে শিখেছিলেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ও অশ্বত্থামা  

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অশ্বত্থামা কৌরবদের পক্ষ অবলম্বন করেন। কৌরব রাজপুত্র দুর্যোধন তার প্রিয় বন্ধু ছিলেন কিনা। পুত্রের প্রতি স্নেহের টানে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেন পিতা গুরু দ্রোণাচার্যও। এক অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা ছিলেন এই গুরু দ্রোণ। যুদ্ধে তাকে ঠেকানো যাচ্ছিলো না কোনভাবেই। বিপাকে পড়লেন পঞ্চপাণ্ডব। পরামর্শের জন্য তারা শরণাপন্ন হলেন শ্রীকৃষ্ণের। তিনি পান্ডবদের বলেন, কোন একভাবে যদি গুরু দ্রোণের কানে তার পুত্র অশ্বত্থামার মৃত্যুসংবাদ পৌঁছানো যায়, তাহলে তাকে হারানো সম্ভব। সুচতুর শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ মতে পান্ডবদের মেঝ ভাই ভীম তখন একটা হাতির নামকরণ করেন ‘অশ্বত্থামা’। তারপর বড়ভাই যুধিষ্ঠিরের সামনে হত্যা করেন সেই হাতিকে।

গুরু দ্রোণ যুধিষ্ঠিরের কথা খুব বিশ্বাস করতেন। তাই যুধিষ্ঠির দ্রোণের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘অশ্বত্থামা হতঃ ইতি গজ’ (অশ্বত্থামা নামক হাতি নিহত হয়েছে)। ‘ইতি গজ’ শব্দটি আস্তে উচ্চারণ করাতে গুরু দ্রোণ মনে করেন বুঝি তার প্রাণপ্রিয় পুত্র আর নেই! পুত্রশোকে মুর্মমান দ্রনোচার্য তখন অস্ত্র ও বেঁচে থাকার ইচ্ছা ত্যাগ করেন। আর সেই সুযোগেই পান্ডবদের বীর ধৃষ্টদ্যুম্ন  দ্রোণ কে হত্যা করেন। পিতার এমন প্রতারণার মৃত্যুতে অশ্বত্থামা ভীষণ ক্রোধান্বিত হন। আর সেই ক্রোধ মাত্রা হারায় ভীমের হাতে শোচনীয়ভাবে আহত হওয়া মৃত্যুপথযাত্রী দুর্যোধনের অবস্থা দেখে। দুর্যোধনের শেষ ইচ্ছাপূরণ ও নিজের ক্রোধ নিবারণ করতে রাতের অন্ধকারে দু’জন সঙ্গী নিয়ে পান্ডবশিবিরে প্রবেশ করেন অশ্বত্থামা। হত্যা করেন একে একে ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখন্ডি, দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রসহ আরও অনেককে।

অশ্বত্থামার অভিশাপের  কারণ 

পান্ডবশিবিরে যখন অশ্বত্থামা হত্যা যজ্ঞ চালাচ্ছিল তখন পঞ্চপান্ডব ও শ্রীকৃষ্ণ তখন গঙ্গাতীরে ছিলেন সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন তারা৷ ঋষি ব্যসের আশ্রমে মুখোমুখি হন অশ্বত্থামার।

তাদের দেখে পুরোনো ক্রোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তার৷ ফলে পান্ডবদের তৃতীয় ভাই অর্জুনের দিকে তাক করে ব্রহ্মাস্ত্র ছোঁড়েন। পুত্রশোকে ক্ষুব্ধ অর্জুনও কম যান না। জবাবে তিনিও গুরু দ্রোণের কাছ থেকে শেখা ব্রহ্মাস্ত্র শমন করেন। দু’ দু’টো দৈবাস্ত্রের সংঘর্ষের ফলাফলে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। তাই মুনিঋষি ও দেবতাগণ অনুরোধ করেন তাদের যেন তারা অস্ত্রগুলো ফিরিয়ে নেন৷ দেবতাদের কথায় অর্জুন মন্ত্রোচ্চারণ করে তার অস্ত্র ফিরিয়ে নেন ঠিকই কিন্তু ফিরিয়ে নেয়ার মন্ত্র না জানায় অশ্বত্থামা ব্যর্থ হন। শ্রীকৃষ্ণ তাকে তখন সেই অস্ত্র কোন নির্জন গ্রহের দিকে তাক করার পরামর্শ দেন। কিন্তু অশ্বত্থামা তার কথা কানে না নিয়ে অস্ত্রটা তাক করেন অর্জুনপুত্র অভিমন্যুর বিধবা স্ত্রী উত্তরার গর্ভের দিকে। উত্তরা তখন গর্ভবতী ছিলেন। পান্ডবদের শেষ বংশধর পরীক্ষিত তার গর্ভে ছিলো। অশ্বত্থামার ছোঁড়া ব্রহ্মাস্ত্রে মৃত্যু ঘটে তার।

উত্তরার সন্তানকে পুনরায় জীবিত করেন শ্রীকৃষ্ণ। ক্রোধান্বিত তিনি তখন। পান্ডবদের শোচনীয়তা ক্ষেপিয়ে দিয়েছে তাকে। ক্ষেপিয়ে দিয়েছে বোনের বিধবা পুত্রবধূর অমন দূরাবস্থাও। অভিশাপ দেন অশ্বত্থামাকে তিনি তাই। তার সমস্ত পাপ ও অপকর্মের। বজ্র গলায় বলেন,

‘হে অশ্বত্থামা, প্রতিটা মানুষের পাপ তুমি তোমার কাঁধে বহন করবে আর তা নিয়ে সমস্ত পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে তুমি একা অশরীরী এক প্রেতের মতো। সময়ের শেষ পর্যন্ত কোন ভালোবাসা, সম্মান তোমার জীবনে আর কখনও আসবে না। কোন আশ্রয়, আদর আপ্যায়ন কিছুই নেই তোমার জন্য। নিশ্ছিদ্র একাকীত্ব হবে তোমার সঙ্গী। মানুষ ও সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হবে তুমি। সারা শরীর জুড়ে এমন ব্যাধি ও ঘা হবে তোমার, যা কোনদিনও সারবে না। সর্বোচ্চ হতভাগ্য জীবন হবে তোমার, অশ্বত্থামা। সময়ের সমাপ্তি পর্যন্ত কোন ভালোবাসা, স্নেহ না জুটুক তোমার জীবনে।’

জন্মের সময় এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতাসম্পন্ন মণি কপালের ঠিক মাঝখানে নিয়ে জন্মেছিলেন অশ্বত্থামা। এই মণির ক্ষমতায় কোন রোগ, অসুখ, ক্ষুধা, সর্পভয়, প্রেত-পিশাচের ভয়, গন্ধর্ব শয়তানের প্রকোপ থেকে রক্ষিত ছিলেন তিনি। অভিশাপ দেয়ার প্রাক্কালে শ্রীকৃষ্ণ সেই মণি তার কাছ থেকে নিয়ে নেন। মণিটি তুলে নেয়ার পরে সেখানে একটা বিশাল জখম তৈরি হয়। শ্রীকৃষ্ণের অভিশাপে সে জখম কখনও সারবে না৷ শুধু তাই নয়, ঐ ঘায়ের স্থান কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হবে আর তা থাকবে কলিকালের শেষ পর্যন্ত। যতদিন না কলিযুগের শেষে দেবতা বিষ্ণুর দশম অবতার কল্কিদেবের সাথে তার দেখা হচ্ছে। কল্কিদেবের কথা জানেন তো? যদি না জানেন তবে সেই গল্প  আরেকদিনের জন্য থাকুক।

শেষের কথা

অশ্বত্থামা কে নিয়ে ডাক্তার, পাইলট বাবা, আর অসিগড়ের ঐ গ্রামবাসীদের দাবি তাহলে নিছক গল্প বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না, তাই না? তবে স্বীকার করতে দোষ নেই, কোন এক রহস্য আছে এখানে। ব্যাখ্যাতীত কোন ঘটনা হয়ত।

অতএব এরপর আপনাদের মাঝে কেউ যদি কপালে অদ্ভুত ক্ষত থাকা কোন বয়স্ক লোককে দেখেন, সাধারণ কেউ ভেবে অসম্মান করবেন না যেন! কে জানে তিনি হতেও পারেন, মহাভারতের বিখ্যাত যোদ্ধা অশ্বত্থামা!

Exit mobile version